২০২৬ সালের মার্চ মাসে ভিয়েতনাম সরকার তাদের নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আইন, যা ‘ল ১৩৪/২০২৫/কিউএইচ১৫’ নামে পরিচিত, কার্যকর করা শুরু করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ। ভিয়েতনামের এই আইনি কাঠামোর মূল লক্ষ্য হলো ডেটা প্রবাহের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করা, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং এআই প্রযুক্তির সাথে জড়িত বিভিন্ন ঝুঁকি হ্রাস করা। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো সাধারণত স্বেচ্ছাসেবী বা নির্দেশনামূলক এআই নীতিমালা অনুসরণ করে থাকে, সেখানে ভিয়েতনামের এই আইনি বাধ্যবাধকতা একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
নতুন এই আইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকিকে তিনটি স্তরে—উচ্চ, মাঝারি ও নিম্ন—বিভক্ত করা হয়েছে, যা ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সরকারি নিয়ন্ত্রণের পরিধি নির্ধারণ করে। আইনটি ভিয়েতনামে কর্মরত দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্যই প্রযোজ্য। তবে উদ্ভাবন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে, ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ডেভেলপারদের কঠোর শাস্তির হাত থেকে রেহাই দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিয়েতনামের এই আইনটি আসিয়ানের আঞ্চলিক স্বেচ্ছাসেবী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক। এর ফলে অঞ্চলে একটি ‘রেস টু দ্য বটম’ বা প্রতিযোগিতামূলক শিথিল নীতি তৈরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যেখানে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা বিনিয়োগকারীরা কম নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের দিকে ঝুঁকে পড়বে। উল্লেখ্য, আসিয়ান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এআই গভর্নেন্স ও নৈতিকতা বিষয়ক একটি গাইড প্রকাশ করেছিল, যা পরবর্তীতে ২০২৫ সালে জেনারেটিভ এআই-এর নিরাপত্তা ও কনটেন্ট তৈরির মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত করা হয়। আসিয়ানের এই নীতি-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই খাতের সাথে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার ধারণাকে প্রতিফলিত করে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আসিয়ান ‘আসিয়ান ডিজিটাল ইকোনমি ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’-এর অধীনে আইনত বাধ্যতামূলক কোনো কাঠামোর দিকে অগ্রসর হতে পারে।
ভিয়েতনামের এই নতুন আইনের বড় একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এতে পরিবেশগত অবক্ষয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ২৫.৫ মিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করে, যা ভিয়েতনামের একটি মাঝারি শহরের প্রায় ৩ লাখ বাসিন্দার দৈনিক পানির চাহিদার সমান। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর তালিকায় ভিয়েতনাম অন্যতম হওয়ায়, এআই অবকাঠামো রক্ষায় পানির এই বিপুল ব্যবহার স্থানীয় ও আঞ্চলিক পানির মজুদকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, ভিয়েতনামের এই এআই আইনটি ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলোকে এড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শ্রম ও জমির মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এআই-এর কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।




























