রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘাত। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে পেশাদার ভাড়াটে খুনি বা 'কন্ট্রাক্ট কিলিং'-এর ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর তদন্তে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ৪০১ জন ভাড়াটে শুটার সক্রিয় রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ২৪ জুলাই রাতে মিরপুরের কাফরুলে যুবদলকর্মী মো. ইউসুফ আলীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডিবির তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, স্থানীয় আধিপত্য, টেন্ডার এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চারজন পেশাদার শুটার ভাড়া করা হয়েছিল। ঘটনার সময় প্রকৃত টার্গেট অন্য কেউ থাকলেও বাগবিতণ্ডার জেরে ইউসুফ আলী নিহত হন। এ ঘটনায় মূল শুটার চঞ্চল মোল্যাসহ মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এর আগে ১২ জুন পশ্চিম রামপুরায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্লা পলাশকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া ২৮ এপ্রিল নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যাকাণ্ডেও ভাড়াটে শুটার ব্যবহারের তথ্য মিলেছে। তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কাওরান বাজারে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এছাড়া গুলশান-বাড্ডা এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও বিএনপি নেতা সাধন হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশনার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীর আটটি অপরাধ বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাড়াটে শুটার সক্রিয় রয়েছে মতিঝিল বিভাগে, যেখানে তালিকাভুক্ত শুটারের সংখ্যা ১১৮ জন। এর মধ্যে মতিঝিল থানাতেই রয়েছেন ১০৬ জন। এছাড়া ওয়ারী বিভাগে ৭৩, তেজগাঁওয়ে ৬১, মিরপুরে ৬০, রমনায় ৩৬, লালবাগে ২৪, গুলশানে ১৬ এবং উত্তরায় ১৩ জন ভাড়াটে শুটার সক্রিয়। ডিএমপি বর্তমানে এই তালিকা হালনাগাদ করার কাজ করছে। পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ১২২টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্তত ৯টি ছিল পরিকল্পিত কন্ট্রাক্ট কিলিং।
এ বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বরং সংঘবদ্ধ অপরাধ। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন এভাবে সক্রিয় থাকতে পারে না। তার মতে, রাজনৈতিক স্বার্থেই এসব অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিটি হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ভাড়াটে শুটার ও পেশাদার খুনিদের তালিকা নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে এবং অপরাধী যেই হোক, কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।































