সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনে গঠিত পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়া এই দুই ইউনিটের নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মপরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পুলিশ সদরদপ্তর থেকে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ বেড়ে যাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিএমপি’র বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি গঠন করে। সাতটি সাব-বিভাগে বিভক্ত এই ইউনিটের মধ্যে রয়েছে সোয়াট, সাইবার ক্রাইম তদন্ত বিভাগ, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও কে-নাইন টিম। ২০১৬ সালের ১লা জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর সিটিটিসি কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। এসব অভিযানে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে নয়জনসহ অনেকে নিহত হয়, যাদের পুলিশ জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। তবে এসব অভিযান নিয়ে বর্তমানে প্রশ্ন উঠেছে এবং কল্যাণপুরের ঘটনায় মামলাও হয়েছে। এরপর ২০১৭ সালে সারা দেশে উগ্রবাদ দমনে পুলিশ সদরদপ্তরের অধীনে এটিইউ গঠন করা হয়।
৭ই জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবে এটিইউ’র নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট (এসএসইউ)’ করার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের যুক্তি, বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা হুমকির ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সহিংস উগ্রবাদের পাশাপাশি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বিস্তৃত কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। পরবর্তীতে ৮ই জুন ডিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে সিটিটিসি’র নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট-ডিএমপি (এসএসইউ-ডিএমপি)’ করার নির্দেশনা দেয়া হয়। সর্বশেষ প্রস্তাবনায় অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স ইউনিট (এসআরইউ)’ এবং সিটিটিসি’র নাম ‘স্পেশাল রেসপন্স টিম ডিএমপি (এসআরইউ ডিএমপি)’ করার কথা বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আপাতত শুধু নাম পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, কার্যক্রমে তেমন পরিবর্তন না-ও আসতে পারে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউ’র কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। এ দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম, আটক রাখা, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক ও এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি জানান, এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন করা হতো। গুম সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও এসব অভিযোগের উল্লেখ রয়েছে। তবে পুলিশ নীতিনির্ধারকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা জরুরি। নতুন নামে পরিচালিত হলে সংস্থাগুলো পূর্বের বিতর্কিত ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে জনআস্থা পুনর্গঠনে সুবিধা পাবে।
এদিকে, নাম পরিবর্তনের গুঞ্জনের মধ্যেই দেশে উগ্রবাদী তৎপরতা থেমে নেই। গত শুক্রবার মতিঝিল মেট্রো রেলের নিচে একটি শক্তিশালী পাইপ বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করেছে পুলিশ। এছাড়া গত ২৬শে ডিসেম্বর হাসনাবাদ হাউজিং এলাকার একটি মাদ্রাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক ও ৯টি তাজা ককটেল জব্দ করা হয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত এপ্রিলে সংসদ ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার সতর্কতাও জারি করেছিল পুলিশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু নাম বা পোশাক পরিবর্তন করে বিতর্কমুক্ত হওয়া কঠিন। তিনি মনে করেন, সংস্থাগুলোর কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আইনগত ভিত্তি প্রদান এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ইউনিটগুলোর মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে অন্য কাজে মনোনিবেশ করলে দেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।


























