দেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনার পর এবার সয়াবিন তেলেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারে বিক্রি হওয়া বোতলজাত ও খোলা—উভয় ধরনের সয়াবিন তেলেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানালাইসিস-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি বাংলাদেশে ভোজ্যতেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্তের প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা বলে দাবি করেছেন গবেষকরা।
গবেষণার জন্য রাজধানীর তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বিভিন্ন সুপারশপ ও খোলা বাজার থেকে তিনটি ব্র্যান্ডেড ও তিনটি নন-ব্র্যান্ডেড (খোলা) সয়াবিন তেলের মোট ৬০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক ও রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে গড়ে ৫৩ হাজার ৯২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি এবং বোতলজাত তেলে ৪৮ হাজার ৬৭টি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ বোতলজাত তেলের তুলনায় খোলা তেলে দূষণের মাত্রা প্রায় ১.২৪ গুণ বেশি, যার মধ্যে তেজগাঁওয়ের খোলা তেলের নমুনায় দূষণ ছিল সর্বোচ্চ।
তেলের নমুনায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার—লো-ডেনসিটি পলিইথিলিন (LDPE), হাই-ডেনসিটি পলিইথিলিন (HDPE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পলিইথিলিন টেরেফথ্যালেট (PET), পলিইউরেথেন (PU) এবং নাইলন শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, ভোজ্যতেলে পলিইউরেথেন ও নাইলনের উপস্থিতি বিশ্বে প্রথমবারের মতো এই গবেষণায় নথিভুক্ত হলো। শনাক্ত হওয়া কণার ৮২ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল আঁশজাতীয় বা ফাইবার এবং ৫৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ছিল স্বচ্ছ। এর মধ্যে ১০১ থেকে ৫০০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খোলা তেলে দূষণের পেছনে শিল্পকারখানার ঘনত্ব, টেক্সটাইল শিল্পের সান্নিধ্য, সংরক্ষণের পাত্রের বারবার ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার ত্রুটি দায়ী হতে পারে। অন্যদিকে, বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন ধাপ দূষণের উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণায় মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি প্রাক্কলনও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শুধু সয়াবিন তেল থেকেই প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করেন। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি; তারা প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি এবং বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, একটি শিশু তার জীবদ্দশায় প্রায় ২০ লাখ ৯০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শরীরে গ্রহণ করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব কণা পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, বিপাকীয় জটিলতা এবং কোষের ক্ষয় ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো কোষের দেয়াল ভেদ করে রক্তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।























