দেশের বাইরে একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। তারই অংশ হিসেবে এই সহিংস ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন উপদেষ্টারা।
শনিবার রাঙামাটির পর খাগড়াছড়িতে বিকালে ডিসির সম্মেলন কক্ষে রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিশেষ মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এএফ হাসান আরিফ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় কিছু ‘দুস্কৃতকারীর’ উস্কানিতে পাহাড়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধানোর অপচেষ্টা করছে তারা।”
‘গুজবে কান দিয়ে’ কেউ যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন, সে বিষয়ে সবাইকে সর্তক থাকার আহ্বান জানান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম।
মতবিনিময় সভায় পাহাড়ি-বাঙালি নেতারাও মনে করেন, একটি অংশ পাহাড়ে শান্তি-সম্প্রীতি চায় না; তারা এ সহিংসতা ঘটিয়েছে। তবে শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসনকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
সংঘাতের ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
খাগড়াছড়ি-রাঙামাটিতে ঘটে যাওয়া সহিংতা তদন্তে শিগগির একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সভা শেষে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বাইরে একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিরাজমান সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। তারই অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাঙামাটির সহিংস ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবারের সহিংস ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, রাঙামাটির ঘটনায় যারা জড়িত, তা তদন্ত করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত টিম গঠন করা হবে। পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনোভাবে অবনতি হতে দেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে কেউ পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করলে তাদের হাত ভেঙে দেওয়া হবে। এ সহিংস ঘটনায় যারা জড়িত, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
পাহাড়ের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন এই দুই উপদেষ্টা। এর আগে গতকাল দুপুরে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে রাঙামাটিতে আসেন তিন উপদেষ্টা। অন্য উপদেষ্টা ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা। রাঙামাটি সেনা রিজিওনের সম্মেলনকক্ষে সভা করেন তাঁরা।
প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লে. জেনারেল (অব.) আব্দুল আজিজ, পুলিশ মহাপরিদর্শক মাইনুল ইসলাম, বিজিবির মহাপরিচালক আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, এনএসআইয়ের ডিজি আবু মোহাম্মদ সারোয়ার ফরিদ, রাঙামাটি জেলা প্রশাসক মো. মোশারফ হোসেন খান, চাকমা সার্কেল চিফ রাজা দেবাশীষ রায়, জেএসএস কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার, বিএনপির জেলা সভাপতি দীপন তালুকদার, পাংখোয়া সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনের সাধারণ সম্পাদক রেম লিয়ানা পাংখোয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সভাপতি কাজী মুজিবুর রহমান, জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি হারুন রশীদ মাতব্বর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা বলেন, মূলত গুজব ছড়িয়ে রাঙামাটির পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, সবাইকে ধংসাত্মক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। সে পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কাজ করতে হবে। পাহাড়ে সম্প্রীতি বজায় রাখতে পাহাড়ি-বাঙালি সবাইকে কাজ করতে হবে।
এদিকে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনার প্রতিবাদে তিন পার্বত্য জেলায় ৭২ ঘণ্টার অবরোধ শুরু করেছে পাহাড়িরা। অবরোধের প্রথম দিন গতকাল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। তবে সড়ক অবরোধের কারণে দূরপাল্লার কোনো যানবাহন ছেড়ে যায়নি। শহরের ভেতর কিছু হালকা যান চলাচল করেছে। বন্ধ রয়েছে দোকানপাট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
রাঙামাটি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বহাল রয়েছে ১৪৪ ধারা। মাঠে রয়েছে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। কোথাও কাউকে জড়ো হতে দিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জুম্ম ছাত্র-জনতার ঘোষিত তিন পার্বত্য জেলায় ৭২ ঘণ্টা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছে ইউপিডিএফ। ইউপিডিএফের জেলা সংগঠন অংগ্য মারমা জানান, অবরোধের প্রথম দিন শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়েছে।
অবরোধের বিষয়ে খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আরিফিন জুয়েল বলেন, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। জেলা সদর ও উপজেলাগুলোয় পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল রয়েছে।
































