হিরোশিমায় যখন পারমাণবিক বোমাটি ফেলা হয়েছিল, তখন শহরের অধিকাংশ মানুষই কোনো উড়োজাহাজ দেখতে বা শুনতে পাননি। এমনকি কোনো বিস্ফোরণের শব্দও তাদের কানে পৌঁছায়নি। তারা কেবল দিনের আলোতে একটি অদ্ভুত আলোর ঝলকানি দেখেছিলেন অথবা সেই তীব্র আলোর প্রতিফলনটুকু অনুভব করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেখানে ঘটেছিল এক প্রলয়ঙ্কারী বিস্ফোরণ। সম্প্রতি অবমুক্ত হওয়া যাজক কিয়োশি তানিমোতোর একটি অপ্রকাশিত স্মৃতিকথায় হিরোশিমার সেই ভয়াবহ দিন এবং তার পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের বিবরণ উঠে এসেছে।
স্মৃতিকথায় তানিমোতো উল্লেখ করেছেন, তার চার্চের অন্যতম সদস্য মিস্টার কোন্দার বাবা-মা বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ইয়োকোগাওয়া স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা আকাশ থেকে একটি বি-২৯ বিমান এবং একটি প্যারাসুট পড়তে দেখেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তারা নিজেদের সম্পূর্ণ বিবস্ত্র ও দগ্ধ অবস্থায় আবিষ্কার করেন। চারপাশের সব বাড়িঘর মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে তারা শহরতলির দিকে দৌড়াতে শুরু করেন। কোই হাইওয়ে দিয়ে ছুটে যাওয়া অন্য মানুষদের অভিজ্ঞতাও ছিল ঠিক একই রকম।
বিস্ফোরণের পর কোই এবং ফুকুশিমা ব্রিজ পার হয়ে তানিমোতো যখন কেন্দ্রস্থলের প্রায় এক কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছান, তখন চারপাশের দৃশ্য পুরোপুরি বদলে যায়। শহরতলি এলাকার বাড়িগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এই সীমানার ভেতরের সমস্ত ঘরবাড়ি হাতুড়ি দিয়ে পিষে ফেলা খেলনা ঘরের মতো মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ভেসে আসছিল "তাসুকেতে!" (বাঁচাও!) বলে মানুষের করুণ আর্তনাদ। তানিমোতো আগে বাড়িঘর সরানোর কাজে সাহায্য করার কারণে জানতেন যে, একা একজন মানুষের পক্ষে ধ্বংসস্তূপ থেকে কাউকে টেনে বের করা অসম্ভব। কিন্তু তবুও চারদিকে অসংখ্য মানুষ মাটির নিচে চাপা পড়ে ছটফট করছিল।
আহত মানুষদের সাহায্য করার জন্য থামার পরপরই তানিমোতোর মনে হলো, তার নিজের স্ত্রী, সন্তান ও প্রতিবেশীরাও হয়তো একই অবস্থায় পড়ে আছে। নিজের এলাকার প্রতিরক্ষা সমন্বয়কারী হিসেবে ১২০টি প্রাণের দায়িত্ব ছিল তার ওপর। তাকে দ্রুত নিজের পোস্টে ফিরতে হতো। তিনি কাঁদতে কাঁদতে আটকা পড়া মানুষদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বন্য মানুষের মতো দৌড়াতে লাগলেন। ফুকুশিমা ব্রিজে তার দেখা হয় মিস্টার মাৎসুও-র সাথে, যিনি বিস্ফোরণের সময় তার সাথেই ছিলেন। তানিমোতো তার কাছে নিজের দায়িত্বের কথা বলে আবার দৌড়াতে শুরু করেন এবং ফুকুশিমা নদীর তীর ধরে এমন একটি পথ খুঁজতে থাকেন যেখানে আগুন কম ছিল। এরপর তিনি নাকাহিরোমাচি নামক একটি এলাকায় পৌঁছান, যেখানে চাষের জমি বেশি থাকায় বাড়িঘর কম ছিল।
সেখানে চারদিকে কেবল আহত মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল। তারা আর হাঁটতে না পেরে রাস্তায় পড়ে ছিলেন। শহরের যত ভেতরে তানিমোতো যাচ্ছিলেন, আহতের সংখ্যা ততই বাড়ছিল। নিজের অক্ষত থাকার গ্লানি থেকে তিনি তার পানামা টুপিটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে মনে মনে সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন। তার মনে হচ্ছিল তার স্ত্রী ও শিশু সন্তান কোকো হয়তো বাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে।
বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক পথ ছিল ওতা নদীর ওপর মিসাসা ব্রিজ পার হয়ে হাকুশিমার দিকে যাওয়া, কিন্তু হাকুশিমা এলাকা তখন আগুনে জ্বলছিল। নদীর ওপারে উশিতা এলাকাটি অক্ষত মনে হওয়ায় তানিমোতো সিদ্ধান্ত নেন নদী সাঁতরে পার হওয়ার। এক ঘণ্টা ধরে একটানা দৌড়ানোর পর তিনি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলেন। তীব্র স্রোতের কারণে তিনি নদীর পানিতে ডুবতে শুরু করেন এবং তার নাক-মুখে পানি ঢুকে যায়। নিজেকে বাঁচাতে তিনি তার পায়ের গেইটার্স, কোট এবং জুতো খুলে শরীর হালকা করেন এবং অবশিষ্ট শক্তি দিয়ে সাঁতরে ওপারে পৌঁছান। তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন তার পরিবারকে বাঁচানোর আগে তার প্রাণ রক্ষা পায়।
উশিতা পার হয়ে তিনি তার চার্চের কোষাধ্যক্ষের বাড়িটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও জনশূন্য অবস্থায় দেখতে পান। অবশেষে তিনি তার স্ত্রীকে খুঁজে পান। তানিমোতো তাকে ডাকলে তিনি অশ্রুসজল চোখে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তানিমোতোর স্ত্রী জানান, ঘরে পৌঁছানোর পরপরই মিসেস তাকাকি তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন এবং দরজায় কথা বলার সময়ই বাড়ি ভেঙে তারা চাপা পড়েন। মিসেস তাকাকি কোথায় জানতে চাইলে তিনি দুঃখের সাথে বলেন, "আমি জানি না।"
পরে তানিমোতো জানতে পারেন, তার স্ত্রী ঘরের ভারী কাঠের নিচে চাপা পড়ে জ্ঞান হারাতে বসেছিলেন। কিন্তু কোলে থাকা শিশু কোকোর কান্নায় তার জ্ঞান ফেরে। তিনি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে কোকোকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। ছাদের চিলেকোঠায় একটি ছোট গর্ত দেখতে পেয়ে তিনি কোনোমতে এক হাত বাড়িয়ে সেটি বড় করেন এবং কোকোকে বাইরে ঠেলে দেন। এরপর নিজে কোনোমতে বের হয়ে আসেন। ততক্ষণে পাশের বাড়িতে আগুন লেগে ধোঁয়া উড়ছিল। কোকোকে কোলে নিয়ে তিনি গলি দিয়ে হেঁটে যান। প্রতিবেশীদের সাহায্য করার কথা ভাবলেও সব বাড়ি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল। শেষ পর্যন্ত আগুন ও ধোঁয়ার তাড়া খেয়ে তিনি সেন্তেই গার্ডেনসে পৌঁছান, তবে তার মন পড়ে ছিল প্রতিবেশীর কাছেই।































