হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএইচসিএ) বার্ষিক নৈশভোজে অংশ নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে নানা রসাত্মক মন্তব্য ও খোঁচা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা উদযাপনের এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প যেমন সাংবাদিকদের প্রশংসা করেছেন, তেমনি ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর এবং ‘ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোম’ নিয়ে তাদের কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি। তিন মাস আগে এক বন্দুকধারীর হামলার কারণে স্থগিত হওয়া এই অনুষ্ঠানটি এবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পুনরায় আয়োজন করা হয়।
ওয়াশিংটন হিলটনে গত এপ্রিলে আয়োজিত প্রথম অনুষ্ঠানটি এক বন্দুকধারীর হামলার কারণে বাতিল হয়েছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত ছিল এমন সমালোচনার মুখে এবারের অনুষ্ঠানটি মূল ভেন্যু থেকে কয়েক মাইল দূরে ওয়াডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। ডব্লিউএইচসিএ-এর বিদায়ী সভাপতি ও সিবিএস নিউজের সাংবাদিক ওয়েইজিয়া জিয়াং জানান, আগামী বছর এই আয়োজনটি আবারও ওয়াশিংটন হিলটনে ফিরে যাবে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, কোনো সহিংসতাকে তারা শেষ কথা হতে দেবেন না।
এদিনের অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের কড়া সমালোচক এবং তাঁর দায়ের করা মামলার মুখোমুখি হওয়া নিউ ইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা পুরস্কার গ্রহণ করতে মঞ্চে আসেন। ট্রাম্প নিজে দাঁড়িয়ে বিজয়ীদের সাথে করমর্দন করেন। এর মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি দলও ছিল, যারা কলঙ্কিত অর্থদাতা জেফরি এপস্টাইনের সাথে ট্রাম্পের সম্পর্কের খবরের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। এ ছাড়া এপ্রিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহত সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তা ভিক্টর গঞ্জালেসকে ট্রাম্প নিজে পুরস্কৃত করেন।
অনুষ্ঠানের আগে হোয়াইট হাউসের প্রেস করপসের অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, ট্রাম্প সাংবাদিকদের তীব্র সমালোচনা করবেন। ট্রাম্পের এক ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তব্যে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক, ডেমোক্র্যাট রাজনীতিবিদ এবং সেলিব্রিটিদের লক্ষ্য করে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কড়া মন্তব্য করা হয়। তবে ট্রাম্প মার্কিন জনগণকে বাকস্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, "আমরা বুলেট দিয়ে নয়, বরং উন্মুক্ত ও জোরালো বিতর্কের মাধ্যমে আমাদের মতভেদ দূর করি। বন্দুক হাতে কোনো উন্মাদ পরাজিত ব্যক্তি কখনই এটি পরিবর্তন করতে পারবে না। আমরা এটি কখনই হতে দিতে পারি না।"
অনুষ্ঠানে বেশ হাস্যোজ্জ্বল মেজাজে থাকা ট্রাম্প সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, "মাঝে মাঝে আমার সত্যিই মনে হয় আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাকে পছন্দ করেন না। এই জায়গাটি আসলে 'ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট সিন্ড্রোম'-এ আক্রান্ত মানুষের সবচেয়ে বড় জমায়েত। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ ভাগ্যবান যে আমাদের আগের নৈশভোজটি মাঝপথে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল… কারণ আমি আপনাদের পেছনে লাগতে যাচ্ছিলাম।" তিনি রসিকতা করে বলেন, তিনি বিদায় নিলে সংবাদ শিল্প দেউলিয়া হয়ে যাবে কারণ তখন সংবাদ লেখার মতো কেউ থাকবে না।
এরপর ট্রাম্প মাথায় ‘ট্রাম্প ২০২৮’ ক্যাপ পরে বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিচ্ছি, এটি এক ধরণের অগ্রিম খবর।" ট্রাম্পের এই মন্তব্য মূলত রসিকতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার তৃতীয় মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন, যদিও মার্কিন সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। ১৯৫১ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের টানা চার মেয়াদে দায়িত্ব পালনের পর এই সংশোধনী আনা হয়েছিল। ট্রাম্প এ পর্যন্ত তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিয়ে দুবার জয়ী হয়েছেন।
হোয়াইট হাউস ও গণমাধ্যমের মধ্যকার চলমান টানাপোড়েনের মাঝেই এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হলো। গত সপ্তাহেও ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী নিরাপত্তা বিষয়ক ভাষণ প্রচার না করায় বেশ কয়েকটি মার্কিন নেটওয়ার্কের লাইসেন্স বাতিলে হুমকি দিয়েছিলেন। এপ্রিলের তুলনায় এবারের আয়োজনটি ছিল বেশ ছোট পরিসরের। সেবার ২,০০০ জনেরও বেশি মানুষ উপস্থিত থাকলেও এবার মাত্র ৭০০ জন অতিথি অংশ নেন।
এবারের অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কঠোর। হোটেলের চারপাশের বেশ কয়েকটি ব্লক অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। অতিথিদের কিউআর কোড, পরিচয়পত্র ও রিস্টব্যান্ডের মাধ্যমে দুই দফায় তল্লাশি করা হয়। এমনকি অতিথিদের রাইফেলধারী দুই সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তার সামনে দিয়ে এক লাইনে হেঁটে যেতে হয়েছে। উল্লেখ্য, এপ্রিলের হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাকে সেসময় বলরুমে যাওয়ার সিঁড়ির কাছাকাছি স্থান থেকে ধরে ফেলা হয়েছিল।
শনিবার রাতের এই অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ, এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল, ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লাটনিক।































