কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের শ্রমের চাহিদা পুরোপুরি শেষ করে দেবে এবং কর্মসংস্থানে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনবে—এমন আশঙ্কা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক তথ্য ও বিশ্লেষণ বলছে, এআইয়ের প্রভাব সম্ভবত ততটা ভয়াবহ হবে না যতটা আগে ধারণা করা হয়েছিল। ক্লদ চ্যাটবটের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক গত মার্চ মাসে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা গেছে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে এআইয়ের কারণে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। যদিও প্রযুক্তিটি অনেক কাজের ক্ষেত্রে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তবে বাস্তবে এর প্রয়োগ এখনো খুব সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, কম্পিউটার ও গণিত বিষয়ক কাজের ক্ষেত্রে ক্লদ থিওরিটিক্যালি ১০০ শতাংশ কাজ করতে পারলেও বাস্তবে এটি মাত্র ৩৩ শতাংশ কাজ কভার করছে।
প্রযুক্তির এই যুগে ডেটাসেন্টারের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের তথ্যপ্রযুক্তি বুমের তুলনায় গত তিন বছরে শ্রম উৎপাদনশীলতা বরং ধীরগতির ছিল। ওপেনএআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যানও এখন এআইয়ের মাধ্যমে চাকরির বাজার ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এমআইটির অর্থনীতিবিদ ডেভিড অটোর উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবীটা যতটা দ্রুত পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটছে না।
এআইয়ের এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী অগ্রযাত্রার বিপরীতে 'ও-রিং' তত্ত্বটি সামনে আসছে। ১৯৮৬ সালে স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার বিপর্যয়ের কারণ ছিল একটি ছোট রাবার ও-রিং, যা উড্ডয়নের ৭৩ সেকেন্ডের মাথায় ২৮ জানুয়ারি ঘটেছিল। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত এআই সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের কাজের গুরুত্ব কমছে না। এআইয়ের কারণে কিছু ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমলেও, নতুন প্রযুক্তির ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উৎপাদনশীলতা বাড়ায় শ্রমের চাহিদা তৈরি হচ্ছে।
অবশ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, এআই নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের তথ্যমতে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এআইয়ের গ্রহণ দ্রুত বাড়ছে এবং এই প্রযুক্তি দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে। তবে বড় ধরনের কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। অর্থনীতিবিদ অটোর মতে, সব কিছু কেবল গাণিতিক সমস্যা নয়; এআই ভাষা বুঝতে পারলেও বাস্তব পৃথিবীর সাথে তার সংযোগ এখনো দুর্বল।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এআইয়ের ব্যাপক বিস্তারের পথে বাধা রয়েছে। ডেটাসেন্টারের বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে, যা জাপানের মোট বিদ্যুৎ খরচের চেয়েও বেশি। এছাড়া এআই মডেলগুলোর দ্রুত অবচয় ঘটছে এবং নতুন মডেল আসার সাথে সাথে আগের বিনিয়োগের মান কমে যাচ্ছে। এমনকি এআই অবকাঠামোয় জিডিপির ২০ শতাংশ, ৩০ শতাংশ বা ৪০ শতাংশ বিনিয়োগ করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অর্থনীতিবিদ দারন আসেমোগলু মনে করেন, এআই মডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর শত শত কোটি ডলার লোকসান করছে এবং তাদের মুনাফা অর্জন করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। সব মিলিয়ে, এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ যেমন উজ্জ্বল, তেমনি এর বাস্তব প্রয়োগ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

































