উত্তর কোরিয়া তার নৌবাহিনীকে শক্তিশালী ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে এক জোরালো তৎপরতা শুরু করেছে। গত ৩ জুলাই দেশটির সুপ্রিম লিডার কিম জং উনের উপস্থিতিতে নতুন গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার 'কাং কন' (৫২) থেকে পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে, গত ২৩ জুন, কোরিয়ান পিপলস আর্মি নেভি (কেপিএএন) আনুষ্ঠানিকভাবে ৫,০০০ টনের ডেস্ট্রয়ার 'চো হিয়ন' (৫১) কমিশনিং করে। এটি উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ।
এই দুটি বড় ঘটনা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তর কোরিয়া তার প্রতিরক্ষা খাতের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করেছে এবং নৌবাহিনীকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। 'চো হিয়ন'-এর কমিশনিং অনুষ্ঠানে কিম জং উন ঘোষণা করেন যে, ৭০ বছরেরও বেশি সময় স্থবির থাকার পর উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনী অবশেষে এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের এই দ্রুত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ, নতুন নৌঘাঁটি স্থাপন এবং বিদ্যমান ঘাঁটিগুলোর আধুনিকীকরণ মিত্রদেশগুলোর নৌ-আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও জটিল করে তুলবে, যা কোরীয় উপদ্বীপে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান যৌথভাবে এই উদীয়মান হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম।
উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর বর্তমান অগ্রগতির পেছনে রয়েছে ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা। সে সময় কিম জং উন সামরিক কৌশল ও কার্যক্রমে নৌবাহিনীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এর আধুনিকীকরণের তাগিদ দেন। পরবর্তীতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার ৯ম কংগ্রেসে কিম তাঁর নতুন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারের রূপরেখা উন্মোচন করেন। এই পরিকল্পনার আওতায় সব সামরিক ঘাঁটি আধুনিকীকরণ, দক্ষিণ সীমান্ত আরও শক্তিশালী করা এবং প্রচলিত অস্ত্রগুলোকে বিশ্বমানের করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
এই লক্ষ্য অর্জনে গত মার্চ মাসে কিম জং উন নির্দেশ দেন যে, নৌবাহিনীকে প্রতি বছর 'চো হিয়ন' বা তার চেয়ে বড় আকারের দুটি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে হবে। ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে অন্তত ১২টি বড় যুদ্ধজাহাজ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে এই লক্ষ্য আরও সম্প্রসারিত করে কিম একটি নতুন ১০,০০০ টনের গাইডেড মিসাইল ক্রুজার ডিজাইনের নির্দেশ দেন এবং অতিরিক্ত নৌঘাঁটি তৈরির তাগিদ দেন। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চোংজিন ও নামপো-র জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীর এই সাম্প্রতিক সাফল্য অতীতের ব্যর্থতার তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১০-এর দশকে দেশটি ছোট করভেট যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে মনোযোগ দিয়েছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে সক্ষম ছিল ২,০০০ টনের 'আমনক' ক্লাসের দুটি জাহাজ। রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম এই যুদ্ধজাহাজগুলোতে ১০০ মিলিমিটারের প্রধান গান, সাবমেরিন-বিধ্বংসী রকেট লঞ্চার এবং বিমান ও জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার রয়েছে। এই ক্লাসের একমাত্র যুদ্ধজাহাজ 'পেট্রোল শিপ নম্বর ৬৬১' ২০২৩ সালের আগস্টে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রদর্শিত হয়। তবে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা বা অন্যান্য এশীয় ডিজাইনের তুলনায় এর অস্ত্র ও সেন্সরগুলো অত্যন্ত পুরোনো ছিল।
এছাড়া উত্তর কোরিয়া তুলনামূলক কম ক্ষমতাসম্পন্ন 'তুমান' ক্লাসের আরও দুটি করভেট তৈরি করেছিল, যা মূলত আমনক ক্লাসের জাহাজগুলোকে সহায়তার কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে এই দুটি ক্লাসের জাহাজ নির্মাণেই উত্তর কোরিয়াকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ৬৬১ নম্বর যুদ্ধজাহাজটির নির্মাণকাজ ২০১১ সালে শুরু হলেও এটি ২০১৭ সালে সার্ভিসে আসে এবং ২০২৩ সালের আগস্টে এর সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়। অর্থাৎ, একটি জাহাজ নির্মাণ ও পরীক্ষায় এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে। একইভাবে ২০১১ সালে শুরু হওয়া তুমান ক্লাসের জাহাজগুলোর নকশায় ত্রুটির কারণে ২০১৪ ও ২০১৭ সালে পুনরায় সংস্কার কাজ করতে হয়েছিল। অতীতের এই দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা কাটিয়ে উত্তর কোরিয়া যেভাবে দ্রুত গতিতে চো হিয়ন-ক্লাসের ডেস্ট্রয়ার নির্মাণ করছে, তা দেশটির নৌবাহিনীর সক্ষমতার এক নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
































