দীর্ঘ ৬৮ বছরের রাষ্ট্রীয় পরিচয়হীনতা আর সীমাহীন বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কার্যকর হয়েছিল ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়। ১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হওয়া এই ছিটমহলগুলোর বাসিন্দারা এখন ফিরে পেয়েছেন তাঁদের নাগরিক অধিকার। এই পরিবর্তনের এক দশক ছুঁইছুঁই সময়ে এসে কেমন আছেন বিলুপ্ত ছিটমহলের মানুষগুলো, তা উঠে এসেছে তাঁদেরই যাপিত জীবনের গল্পে।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম পেশায় একজন সাইকেল মেকানিক। কালীরহাট বাজারে কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১৫ সালের আগে তাঁদের কোনো মানুষের মর্যাদা ছিল না। ছিটমহল বিনিময়ের পরই মূলত তাঁরা মানুষের খাতায় নাম লেখাতে পেরেছেন। একই বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে রসুল আলী নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের আগে এখানকার মানুষ কখনো মন খুলে হাসতে পারত না, যা এখন তারা পারছে। এই পরিবর্তনের গভীরতা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ছিটমহল বিনিময়ের আগের দিনগুলোতে।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই ছিটমহলবাসীর জীবন চরম অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত হয়। ভৌগোলিক সীমানার মারপ্যাঁচে পড়ে তাঁরা শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় সেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরিচয়পত্র ও বৈধ ঠিকানার অভাবে অনেককে শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য মিথ্যা পরিচয়ের আশ্রয় নিতে হতো। প্রতিবেশীদের বাবা-মা সাজিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি কিংবা ভুল ঠিকানা দিয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হতো তাঁদের। বাজারে পণ্য বিক্রি করতে গেলেও 'ছিটের মানুষ' পরিচয়ের কারণে তাঁদের পণ্যের দাম কম দেওয়া হতো।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতির কারণে বড় ছিটমহলগুলোতে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে এক ধরনের শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। যেমন দাসিয়ারছড়ার প্রায় ৮-১০ হাজার মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে বিচারব্যবস্থা চালু ছিল এবং একটি টিনের ঘরের দুটি কক্ষকে কারাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় অনেক ছিটমহলে চোরাচালান, মাদক ও জুয়ার আখড়াও গড়ে উঠেছিল।
ঐতিহাসিক এই ছিটমহল বিনিময়ের পটভূমি ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর মধ্যে একটি সমঝোতা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ঐতিহাসিক স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অবশেষে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে কার্যকর হয় এই চুক্তি। দুই দেশের মোট ১৬২টি ছিটমহলের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহল বিনিময় হয়। ২০১১ সালের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী, এসব ছিটমহলে ৫১ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
বিনিময়ের সময় বাসিন্দাদের নিজেদের পছন্দমতো দেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ মানুষ তাঁদের আদি বসতভিটাতেই থেকে যান, তবে কিছু পরিবার বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যায়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া পরিবারগুলোর একজন নজরুল ইসলাম। দাসিয়ারছড়া ছেড়ে ভারতে স্থায়ী হওয়া নজরুল সম্প্রতি বাংলাদেশে বেড়াতে এসে জানান, জন্মভূমি ছেড়ে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া সবার জন্য সহজ ছিল না। তাঁর মতে, হিন্দুরা সেখানে সহজে মানিয়ে নিতে পারলেও মুসলমানরা ততটা পারেননি। সুযোগ পেলে অনেকেই আবার বাংলাদেশে ফিরে আসতে চান, যদিও ভারত সরকার তাঁদের কোনো সমস্যায় ফেলছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমানে বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে ব্যাপক উন্নয়ন দৃশ্যমান। রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হতে পারাটা তাঁদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এত অল্প সময়ে এত সুবিধা পাবেন তা তাঁরা ভাবেননি। তবে ভূমি ও নাগরিকত্ব সংক্রান্ত কিছু ছোটখাটো সমস্যা এখনো রয়ে গেছে, যা সরকার দ্রুত সমাধান করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা রাতারাতি দূর করা সম্ভব না হলেও, এই পিছিয়ে পড়া নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।



























