ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপদাহ ও খরা নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত বাঁধ (ডাইক) এবং জার্মানির অভ্যন্তরীণ নদী-বাণিজ্যে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও ক্রিট দ্বীপে দাবানলের পাশাপাশি দানিয়ুব ও রাইন নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে। এর ফলে নেদারল্যান্ডসের নিচু এলাকার সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত বাঁধগুলোতে ফাটল দেখা দিচ্ছে এবং জার্মানির অন্যতম প্রধান নৌপথে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পূর্বে অবস্থিত ওয়াডিন্সভিন (Waddinxveen) নামক একটি ছোট শহরের কৃষি জমিতে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন জেরোয়েন উডা (Jeroen Wouda) এবং ডার্ক বুম (Dirk Boom)। তাঁরা ধাতব রড দিয়ে শুকনো মাটি পরীক্ষা করছেন এবং ফাটল বা লিক খুঁজছেন। ১৯ শতকের মার্কিন লেখিকা মেরি ম্যাপেস ডজের বিখ্যাত উপন্যাসের সেই কিশোরের মতো আঙুল দিয়ে বাঁধের ফুটো বন্ধ করার দিন এখন আর নেই; আধুনিক এই স্বেচ্ছাসেবকরা অ্যাপের মাধ্যমে বাঁধের ফাটল শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত মেরামতের জন্য পাঠাচ্ছেন।
নেদারল্যান্ডসের এই বাঁধগুলো মূলত পিট (কয়লাজাতীয় মাটি) দিয়ে তৈরি, যা শক্তিশালী রাখতে সব সময় আর্দ্র থাকা প্রয়োজন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ মিটার (১৬ ফুট) নিচু এই এলাকায় অতিরিক্ত খরার কারণে পিট মাটি শুকিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। শিয়েল্যান্ড এন ডি ক্রিম্পেনারওয়ার্ড (Schieland en de Krimpenerwaard) ওয়াটার কর্পোরেশনের বন্যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপক পিটার ভ্যান ডুইভেনডাইক (Peter van Duijvendijk) জানান, মাটি দুর্বল হলে বাঁধ ভেঙে পানি পোল্ডারে (সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা জমি) ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাঁর অধীনে ১৪০ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) দীর্ঘ বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাইন নদীর নাব্যতা সংকটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোলন শহরে রাইন নদীর পানির স্তর ২০১৮ সালের অক্টোবরের রেকর্ড সর্বনিম্নের চেয়েও নিচে নেমে গেছে। রাইনকার্গো (RheinCargo) কোম্পানির ব্যবস্থাপক মার্সেল বেক (Marcel Beck) জানান, স্বাভাবিক সময়ে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ মেট্রিক টন পণ্য বহনকারী জাহাজগুলো এখন মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ মেট্রিক টন পণ্য নিয়ে চলতে পারছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখতে পরিবহন ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়ায় বেশ কিছু হাউসবোট বা ভাসমান বাড়ি এখন বালুময় তলদেশে আটকে পড়েছে। হাউসবোটের মালিক ফ্রান্স শিল্টে (Frans Schilte) জানান, আগে খরা এক মাস থাকত, এখন তা তিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। তাঁর লোহার তলাবিশিষ্ট নৌকাটি এখন নদীর বালুময় তলদেশে আটকে আছে। তিনি একে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ডেল্টারেস (Deltares) নামক একটি স্বাধীন পানি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হাইড্রোলজিস্ট ভিন্স কানডর্প (Vince Kaandorp) বলেন, নেদারল্যান্ডসে পানির অভাব নেই, তবে ঋতুভিত্তিক বণ্টনে সমস্যা রয়েছে। শীতকালে দ্রুত পানি নিষ্কাশন করা হলেও গ্রীষ্মে তা ধরে রাখার জন্য মাটিকে 'স্পঞ্জ' বা নদীর পাশে ঝোপঝাড় রোপণের মতো প্রাকৃতিক পদ্ধতি ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। এদিকে লোনা পানির অনুপ্রবেশের কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। নেদারল্যান্ডস ফ্রুট গ্রোয়ার্স অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান জন কুস্টার্স (John Kusters) এই বছরটিকে চাষিদের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে বর্ণনা করেছেন।





























