নাৎসি এসএস (SS) প্রধান হাইনরিশ হিমলারের ব্যক্তিগত ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ফেলিক্স কার্স্টেনকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চলচ্চিত্র ‘আই ইজ অ্যানাদার’ (I Is Another)। লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হওয়া এই ছবিতে কার্স্টেনকে কোনো বীর বা নায়ক হিসেবে নয়, বরং এক চতুর ও সুবিধাবাদী চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন জার্মান লেখক ও পরিচালক ফেলিক্স রান্ডাউ। পাঁচ বছর আগে ফরাসি প্রযোজকরা তাকে কার্স্টেনকে নিয়ে একটি মিনি-সিরিজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু রান্ডাউ শেষ পর্যন্ত একে বড় পর্দায় নিয়ে আসেন এবং এতে এই থেরাপিস্টের তথাকথিত ‘মানবতাবাদী’ মুখোশ উন্মোচন করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কার্স্টেন তার স্মৃতিকথায় দাবি করেছিলেন যে তিনি হিমলারের ওপর নিজের প্রভাব খাটিয়ে বহু মানুষকে গ্যাস চেম্বার ও নির্বাসন থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ফরাসি সাংবাদিক জোসেফ কেসেলের লেখা জীবনীগ্রন্থ ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য মিরাকুলাস হ্যান্ডস’-এও এই দাবিকে সমর্থন করা হয়েছিল। তবে পরিচালক রান্ডাউ এই বইটিকে সম্পূর্ণ ‘মিথ্যা দিয়ে ভরা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। চলচ্চিত্রে ডেনিশ অভিনেতা ক্ল্যাস ব্যাং কার্স্টেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যাকে বেশ চতুর ও রহস্যময় এক চরিত্র হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
চলচ্চিত্রের গল্পে দেখা যায়, কার্স্টেন নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আশায় ওসলোর উদ্দেশ্যে ট্রেনে ভ্রমণ করছেন। যাত্রাপথে হেডা ভোহম্যান (ভ্যালেরি প্যাকনার অভিনীত) নামের এক কাল্পনিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকের মুখোমুখি হন তিনি, যিনি কার্স্টেনের মিথ্যাচার ধরতে তাকে জেরা করতে শুরু করেন। কার্স্টেন সুইডিশ সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন কি না, তা নিয়ে পরিচালক কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাননি, কারণ এই সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ফাইলগুলো এখনও গোপন রাখা হয়েছে।
পরিচালক রান্ডাউ কার্স্টেনকে একজন ‘নার্সিসিস্ট’ বা আত্মমুগ্ধ ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "সে ছিল একজন নার্সিসিস্ট, এবং সব নার্সিসিস্টদের মতোই তার আত্মবিশ্বাস ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তার কাছে একজন নায়ক হওয়াই যথেষ্ট ছিল না, সে সুপারহিরো হতে চেয়েছিল এবং এটাই ছিল তার ভুল।" পরিচালকের মতে, ১৯৪৩ সালে স্টালিনগ্রাদে নাৎসিদের পরাজয়ের পর কার্স্টেন বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের পতন নিশ্চিত। তখন থেকেই তিনি নিজের পিঠ বাঁচাতে হিমলারকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রশংসাপত্র ও নথি তৈরি করেন।
তবে কার্স্টেন যে একজন অসাধারণ ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ছিলেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। হিমলারের তীব্র পেটের ব্যথা তিনি নিমেষেই দূর করতে পারতেন। এ কারণে হিমলার তাকে আদর করে "ম্যাজিক বুদ্ধ যে সব রোগ সারিয়ে তোলে" বলে ডাকতেন এবং তার প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে কার্স্টেন নারীদের প্রতি দুর্বল ছিলেন এবং তার স্ত্রী ও সেক্রেটারির সাথে একটি ত্রিমুখী সম্পর্কে বাস করতেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। ১৯৬০ সালে তিনি মারা যান।
ছবিটির নির্মাণ ও চরিত্র বাছাই সহজ ছিল না। হিমলারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্টিন মুলার। হিমলারকে কোনো কমিক চরিত্রের মতো উপস্থাপন করতে চাননি পরিচালক। তিনি বলেন, হিমলার "স্যাডিস্টিক এবং পুরোপুরি উন্মাদ" হলেও "তবুও একজন মানুষ ছিলেন"। কিছু অভিনেতা এই চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হননি এই ভয়ে যে এটি মন্দকে উৎসাহিত করবে। কিন্তু রান্ডাউ মনে করেন, "মন্দকে বর্জন করলে তা অন্ধকারেই আরও ডালপালা মেলে।"
বর্তমান সময়ে জার্মানির চরম ডানপন্থী দল 'অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি' (AfD)-র উত্থানকে ভীতিকর মনে করেন রান্ডাউ। তিনি বলেন, আজ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনো সাধারণ ঐক্যমত্য নেই, যা একটি বড় সমস্যা। যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করা প্রজন্ম আজ আর বেঁচে নেই উল্লেখ করে তিনি তার ৮৬ বছর বয়সে মারা যাওয়া বাবার প্রথম স্মৃতির কথা বলেন, যেখানে ছিল বোমা হামলা থেকে বাঁচতে মায়ের সাথে দৌড়ানো, জ্বলন্ত রাস্তা আর লাশের স্তূপ। কার্স্টেনের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি প্রকাশ করে পরিচালক বলেন, "সে হয়তো খারাপ উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করেছিল, কিন্তু সে সব নোংরামির সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল।"






























