হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে সরবরাহ করা হয়, যা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে যে তারা সরাসরি আলোচনায় যুক্ত রয়েছে, কিন্তু ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তারা কেবল ওমানের সাথেই সরাসরি কথা বলছে। তেহরান ওমানের সাথে মিলে এই জলপথের ভবিষ্যৎ যৌথ ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর সংকটের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা খুবই কম।
সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সংঘাত ও হামলায় প্রাণহানি ও আহতের ঘটনায় তিনি ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন। এর আগে ইরান যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে জানায় যে, ওয়াশিংটন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত তারা প্রণালী খুলবে না।
তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি জানিয়েছেন, “দুই পক্ষই এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দূরে সরে গেছে।” তিনি আরও বলেন, “কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা থেকে তারা ক্রমশই দূরে সরে যাচ্ছে।” এই পরিস্থিতি তেহরান ও ওমানের মধ্যকার আলোচনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যদিও উভয় দেশই যুদ্ধ অবসানে আগ্রহী বলে দাবি করেছিল।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা গত ৫০ বছরে ইরানের কর্মকাণ্ডে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থ দাবি করব। যদি কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার থাকে, তবে তা ইরানেরই দেওয়া উচিত।” পরবর্তীতে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি দাবি করেন, ২০০০ সালে ইয়েমেনে ইউএসএস কোল জাহাজে হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যদিও সেই হামলার দায় আল-কায়েদার ওপর বর্তেছিল।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতদের পরিবারের জন্যও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তিনি বলেন, “ইরান আলোচনার ক্ষেত্রে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার জনগণের ওপর হওয়া ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর দায়ভারও গ্রহণ করবে।”
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স শনিবার জানিয়েছিলেন যে, তিনি ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে আশাবাদী এবং এটি আমেরিকানদের জন্য ভালো হবে। ভ্যান্স আরও দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালীতে কোনো টোল আরোপের পরিকল্পনা তাদের নেই।
তবে ট্রাম্পের নতুন দাবির পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায় এবং মঙ্গলবারও তা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ইরান জানিয়েছে, প্রণালী খুলে দেওয়া ওয়াশিংটনের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। ইরান গত শনিবার ছয়টি নতুন শর্ত ঘোষণা করেছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন হুমকি ও অপমান বন্ধ করা, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে ইরানের মিত্রদের ওপর হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।
অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ ও জুন ২০২৫-এর ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, ওমানের সাথে নতুন শিপিং লেন নির্ধারণের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রবিবার তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না, তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো মোর্তাজাবি আল জাজিরাকে বলেন, “উভয় পক্ষই বড় ধরনের আলোচনার আগে সর্বোচ্চ দাবি পেশ করছে।” তিনি মনে করেন, ইরানের অর্থনৈতিক ত্রাণ ও সংঘাতের স্থায়ী অবসানের নিশ্চয়তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেইন রোইভারান মনে করেন, হরমুজ প্রণালীর এই অচলাবস্থা কার ধৈর্য বেশি তার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, “প্রশ্ন হলো, কে আগে হাল ছাড়ে? আমেরিকার ভেতরেও এই যুদ্ধ এবং এর পরিণতির বিষয়ে গভীর অসন্তোষ রয়েছে।”
সূত্র: আল জাজিরা




























