বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করার অংশ হিসেবে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে মালয়েশিয়া সরকার। দেশটির অনলাইনভিত্তিক কেন্দ্রীয় অভিবাসী কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম বা ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউএমএস) এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার এই আভাস ইতিবাচক হলেও, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র জনশক্তি প্রেরণকারী প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের (ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড) মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পূর্ববর্তী সরকারি ঘোষণা এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এই তালিকাকে জনশক্তি রপ্তানি খাতের অনেকেই 'নতুন সিন্ডিকেট' হিসেবে আখ্যায়িত করলেও সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া সরকারের প্রকাশিত তালিকাটি তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বোয়েসেলের মাধ্যমেই কর্মী পাঠানো হবে এবং দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিই এর মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ পাবে। এখানে কোনো কিছু গোপন করার সুযোগ নেই বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এদিকে, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী জানান, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে আসলে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পাননি। এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য তারা অপেক্ষা করছেন। তিনি আরও যোগ করেন, তারা চান সব এজেন্সি যেন সমানভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং ন্যূনতম খরচে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারেন।
এর আগে, ২০২৪ সালের মে মাসের শেষে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশসহ সব দেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। সে সময় ছুটিতে দেশে আসা অনেক কর্মীও আর কাজে ফিরতে পারেননি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শ্রমবাজার চালুর চেষ্টা করা হলেও বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। এরপর কয়েক দফা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এই তালিকা প্রকাশ করল। বাংলাদেশ সরকার প্রথমে ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা দিলেও যাচাই-বাছাই শেষে ৩৪০টি এজেন্সির নাম চূড়ান্ত করে পাঠিয়েছিল, যার মধ্য থেকে মালয়েশিয়া তাদের নিজস্ব কাঠামোর ভিত্তিতে ২৫টি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করেছে।
গত ৩০ জুলাই কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় যাওয়া শুরু হবে। তিনি তখন জানিয়েছিলেন, প্রথম ধাপের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো অভিবাসন ব্যয় কমানো, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া।
কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার উইংয়ের মিনিস্টার (লেবার) ছিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষ এখনো তাদের এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আশা প্রকাশ করেছেন যে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই শ্রমবাজার আবার চালুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যাবে। ১৯৭৮ সালে মাত্র ২৩ জন কর্মী পাঠানোর মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এ পর্যন্ত সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সেখানে গেছেন, যা দেশের মোট জনশক্তি রপ্তানির ৯ শতাংশের বেশি। তবে বারবার বন্ধ ও চালু হওয়ার কারণে এই বাজারটি জনশক্তি খাতে একটি 'অস্থিতিশীল বাজার' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলেও মালয়েশিয়ার বাজারে আরও দুই বছর পর শুরু হয় এ যাত্রা।




























