ফুটবল খেলা, সৈকতের বালিতে দৌড়াদৌড়ি, অ্যালিসিয়া কিজ ও নিউ ইয়র্ক নিকসের খেলোয়াড়দের সাথে মঞ্চে নাচ, কিংবা সুইমিং পুল ও সাগরে সাঁতার কাটা—যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্য এসব ক্ষেত্রে স্যুট-টাই পরা একেবারেই বেমানান। কিন্তু গত এক বছর ধরে নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানী যেন একাই প্রমাণ করতে নেমেছেন যে, আনুষ্ঠানিক স্যুট যেকোনো পরিস্থিতির জন্যই উপযুক্ত। তিনি সব ঋতুতেই এবং সব ধরনের কর্মকাণ্ডে স্যুট পরে হাজির হয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন।
মেয়র মামদানীকে প্রায় সবসময়ই গাঢ় রঙের স্যুট, ফরমাল টাই এবং মার্জিত কালো বুট জুতো পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। তিনি এগুলো প্রায়শই 'স্যুট সাপ্লাই' নামক ব্র্যান্ড থেকে কেনেন। পুরুষ রাজনীতিবিদদের জন্য স্যুট পরা কোনো নতুন বিষয় নয়, তবে জোহরান মামদানীর মতো ব্লেজার ও ম্যাচিং ট্রাউজারের প্রতি এমন একনিষ্ঠতা খুব কম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যেই দেখা গেছে। গত মে মাসে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে নিউ ইয়র্ক নিকসের খেলা দেখার সময় তিনি ডার্ক স্যুট ও টাই পরে সবার নজর কাড়েন। দলের জয়ের পর তিনি শার্ট ও টাইয়ের ওপর এবং স্যুট জ্যাকেটের নিচে নিকসের জার্সি পরে এক ব্যতিক্রমী রূপ ধারণ করেন। গত জুনে সমুদ্র সৈকতে শিশুদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনেও তাকে নেভি ব্লু স্যুট, সাদা শার্ট এবং নীল স্ট্রাইপড টাই পরা অবস্থায় দেখা যায়।
তবে এগুলোই তার স্যুট প্রীতির সবচেয়ে অদ্ভুত উদাহরণ নয়। ২০২৫ সালের নববর্ষের দিনে মেয়র পদের প্রচারণা চালানোর সময় তিনি নিউ ইয়র্কের ঐতিহ্যবাহী 'পোলার বিয়ার ক্লাব প্লাঞ্জ'-এ অংশ নিতে কনকনে ঠান্ডা আটলান্টিক মহাসাগরের পানিতে স্যুট পরেই নেমে যান। সে সময় টিকটকে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে তিনি রসিকতা করে বলেন, "আমি জমে যাচ্ছি… তবে নিউ ইয়র্ক সিটির পরবর্তী মেয়র হিসেবে আমি আপনাদের বাড়িভাড়া জমিয়ে (স্থির) রাখব।" গত মাসে হার্লেমের একটি সুইমিং পুল উদ্বোধনের ঘোষণা দিতে গিয়ে তিনি স্যুট পরা অবস্থাতেই পুলে ঝাঁপ দেন। রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম 'নিউ ইয়র্ক পোস্ট' অবশ্য এ নিয়ে সমালোচনা করে লিখেছিল যে, পুলে নামার সময় সাঁতারের পোশাক পরার নিয়ম ভেঙেছেন মেয়র।
মামদানীর পূর্বসূরিরা পোশাকের ক্ষেত্রে এতটা কঠোর ছিলেন না। সাবেক মেয়র বিল ডি ব্লাসিও হাফপ্যান্ট (বিশেষ করে কার্গো শর্টস) পরতে পছন্দ করতেন, যার জন্য তাকে তীব্র উপহাসের শিকার হতে হয়েছিল। অন্যদিকে এরিক অ্যাডামস পোলো শার্ট বা উলের কার্ডিগান পরতে ভালোবাসতেন। ফ্যাশন বিশ্লেষক এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্য এলা দেবীর মতে, মামদানী নিজেকে একজন সার্বক্ষণিক কর্মঠ মেয়র হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। তিনি বলেন, "পোশাকের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান যে তিনি কাজের প্রতি অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাছাড়া তিনি একজন তরুণ, মুসলিম এবং সমাজতান্ত্রিক নেতা।"
ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত আক্রমণের শিকার হওয়া মামদানীকে সম্ভবত শ্বেতাঙ্গ মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদদের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। তুর্কি-আমেরিকান বামপন্থী স্ট্রিমার হাসান পিকারও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। পিকার বলেন, আগে তিনি সাধারণ টি-শার্ট পরলেও এখন ফক্স নিউজের দর্শকদের কথা মাথায় রেখে স্যুট-টাই পরেন, যাতে তার বক্তব্যকে তারা গুরুত্বের সাথে নেয়।
স্যুট পরে পুলে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি সিএনএন-এর এক সাক্ষাৎকারে মেয়র মামদানী রসিকতা করে বলেন, "আমি সম্ভবত 'সুইমস্যুট' (সাঁতারের পোশাক) শব্দটির ভুল অর্থ বুঝেছিলাম। তবে আমি চ্যারিটি শপ 'গুডউইল'-কে ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ মাত্র ৩০ ডলারে আমি ওই স্যুটটি কিনেছিলাম। নিজের ভালো স্যুটগুলো তো আর নষ্ট করা যায় না! তবে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় পোশাক পরার অন্য কোনো উপায় আছে কি না, তা আমি বোঝার চেষ্টা করছি।"
বামপন্থী রাজনীতিবিদরা সাধারণত ফরমাল পোশাকের জন্য পরিচিত নন। যেমন মেইনের সেনেট পদপ্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনার সোয়েটার ও টি-শার্ট পরতেন এবং পেনসিলভানিয়ার ডেমোক্রেটিক সিনেটর জন ফেটারম্যান বাস্কেটবল শর্টস পরার জন্য পরিচিত। তবে বামপন্থীদের এই ধারায় পরিবর্তন আসছে বলে মনে করেন বামপন্থী সাময়িকী 'কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স'-এর সম্পাদক নাথান রবিনসন। তিনি বলেন, "পোশাক যদি বিশ্বাসযোগ্যতা ও কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটায়, তবে তার সুযোগ নেওয়া উচিত নয় কেন? স্যুটের মাধ্যমে মানুষ কাউকে গুরুত্বের সাথে নেয় এবং পেশাদার মনে করে। সমাজতন্ত্রীরা প্রায়ই প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত হন, তাই স্যুট পরার মাধ্যমে মামদানী সমাজতান্ত্রিক ধারণার বৈধতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান।"
ফুটবল খেলার মাঠেও মামদানীর এই স্যুট প্রীতি বজায় রয়েছে। গত জুলাইয়ে তাকে স্যুট-টাই পরা অবস্থায় ফুটবল নিয়ে কসরত করতে দেখা গেছে। এমনকি একটি ম্যাচে খেলার সময় তিনি স্যুটের জ্যাকেট খুলে কেবল শার্টের ওপর ফুটবল জার্সি চাপিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। তবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে পরিস্থিতি এমন ছিল না। তার সাবেক এক সতীর্থ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগে মামদানী মাঠে কালো হাফপ্যান্ট পরেই খেলতেন। তবে তিনি সবসময় স্যুট বা স্যুট প্যান্ট এবং তার বিখ্যাত বুট জুতো পরে মাঠে আসতেন এবং দেরি হওয়ার কারণে মাঠেই পোশাক পরিবর্তন করতেন। ওই সতীর্থ রসিকতা করে বলেন, স্যুট পরে ফুটবল খেলা মোটেও আরামদায়ক বা যৌক্তিক নয়, কারণ এতে কাপড়ের স্থায়িত্ব কমে, ঘাম হয় এবং ঘাসের দাগ লেগে স্যুট নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, মামদানী কি কখনো স্যুট ছাড়া অন্য কিছু পরতে পারবেন? ফ্যাশন বিশ্লেষক এলা দেবী মনে করেন, মেয়র এখন তার এই স্যুট পরার অভ্যাসের জালে নিজেই বন্দি হয়ে গেছেন। তিনি যদি এখন জিন্স পরেন, তবে নিউ ইয়র্ক পোস্ট টানা তিন সপ্তাহ ধরে তা নিয়েই খবর প্রকাশ করবে। অতি সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের তাপমাত্রা যখন ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছায়, তখন হয়তো মামদানী মনে মনে অন্য কিছু পরার কথা ভেবেছিলেন। এলা দেবী তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, ডিজাইনার থম ব্রাউন কিছু ভালো মানের 'স্যুট শর্টস' তৈরি করেন, যা গরমের জন্য উপযুক্ত। তবে থম ব্রাউনের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, এই শর্টসের দাম প্রায় ১,৩০০ ডলার, যা একজন সমাজতান্ত্রিক নেতার ভাবমূর্তির সাথে একেবারেই খাপ খায় না। ফলে আপাতত জোহরান মামদানীকে স্যুটেই বন্দি থাকতে হচ্ছে।


























