মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের ৯ বছর পূর্ণ হলো। এই উপলক্ষে বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে 'রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস' পালন করেছেন লাখো রোহিঙ্গা। গত ২৫ আগস্ট (২০২৬) আয়োজিত এই সমাবেশে তারা তাদের হারানো স্বজনদের স্মরণ করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার এবং নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান।
কক্সবাজারের শরণার্থী ক্যাম্পে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশে ড্রোন ক্যামেরায় দেখা গেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গার উপস্থিতি। বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে হেঁটে এসে তারা এই জমায়েতে যোগ দেন। তাদের হাতে থাকা ব্যানার ও পোস্টারে ফুটে উঠেছে ন্যায়বিচার ও অধিকারের দাবি। ঐতিহ্যবাহী থানাকা, সাধারণ পোশাক কিংবা বোরকা পরা রোহিঙ্গা নারীদের কণ্ঠেও ছিল একই সুর। সমাবেশে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক এবং অধিকারকর্মীরা অশ্রুসজল চোখে তাদের মাতৃভূমির ওপর বয়ে যাওয়া গণহত্যার স্মৃতিচারণ করেন। এক বাবা তার ছোট ছেলেকে কাঁধে নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন, যে শিশুর জন্ম হয়েছে এই ক্যাম্পেই এবং যার মনে নিজের মাতৃভূমির কোনো স্মৃতিই নেই।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে হামলার অজুহাত দেখিয়ে দেশটির সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত নৃশংসতা শুরু করে। abandonment এবং রোহিঙ্গা নাগরিক সমাজের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই হামলায় ৩০০টিরও বেশি রোহিঙ্গা গ্রাম আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। নারীদের ধর্ষণ, জীবন্ত মানুষকে ঘরে আটকে পুড়িয়ে মারা এবং শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলার মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়। প্রাণভয়ে লাখ ও রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময় নৌকাডুবিতেও অনেকের মৃত্যু হয়।
আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) নিশ্চিত করেছে যে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট সহিংসতা শুরু হওয়ার পর প্রথম মাসেই রাখাইন রাজ্যে অন্তত 9000 (৯,০০০) জন রোহিঙ্গা মারা যান, যাদের বেশিরভাগই সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন। (উল্লেখ্য, এই তথ্যসংবলিত মূল প্রতিবেদনটি অনলাইনে পড়ার ক্ষেত্রে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ 2টি ফ্রি নিবন্ধ পড়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।) সমাবেশে ওয়াই ইয়ান নামের একজন রোহিঙ্গা শিক্ষক সেই ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দিয়ে বলেন, "২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো সেই নৃশংস গণহত্যা আমি নিজের চোখে দেখেছি। আমার মাথার ওপর দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি উড়ে যাচ্ছিল। চারপাশে শুধু লাশ আর লাশ পড়ে ছিল, সেগুলো দাফন করার মতো কেউ ছিল না।"
৯ বছর পার হলেও রোহিঙ্গাদের দুঃখ-দুর্দশা কমেনি। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে আরাকান আর্মি। এই দুই পক্ষের সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে আবারও হামলার শিকার হচ্ছে রোহিঙ্গারা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা, অবৈধভাবে আটক এবং জোরপূর্বক তরুণদের নিজেদের বাহিনীতে নিয়োগের মতো যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য অপরাধ করছে। অনেক রোহিঙ্গা মনে করেন, ২০১৭ সালের মতো এবারও তাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আরাকান আর্মি এই বর্বরতা চালাচ্ছে।
২০১৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেননি। ছোট ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক এই শরণার্থীর বোঝা বহন করে চলেছে। বাংলাদেশ সরকার এর আগে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদার নিশ্চয়তা না থাকায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে রাজি হয়নি। রোহিঙ্গারা মনে করেন, মিয়ানমার সরকারকে অবশ্যই তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
রোহিঙ্গা শিক্ষক ও লেখক আবদো রহিম বলেন, "আমরা যদি আমাদের গল্পগুলো টিকিয়ে না রাখি, তবে বিশ্ব আমাদের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ভুলে যাবে। আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মরণ করা এবং বিশ্বকে আমাদের ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।" রোহিঙ্গা কবি ও মানবাধিকার কর্মী সিরাজুল ইসলাম বলেন, "প্রতি বছর আমরা এই আশায় দিনটি পালন করি যেন পরবর্তী বার্ষিকীর আগেই আমরা দেশে ফিরতে পারি। আজ আমরা নবম বার্ষিকী পালন করছি, কিন্তু আমাদের মনের ভেতর সেই একই প্রশ্ন—আমাদের এই আশা কি কখনো সত্যি হবে?"
জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তবে বছরের পর বছর ধরে চলা এসব আহ্বান উপেক্ষিতই থেকে গেছে, যার ফলে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। শত কষ্টের মাঝেও রোহিঙ্গারা ন্যায়বিচার এবং নিজ দেশে শান্তিতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে চলেছেন।




























