পিরোজপুরের সদর উপজেলার কদমতলা গ্রামে কাগজে-কলমে একটি ব্রিজের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে সেখানে রয়েছে কেবল একটি বাঁশের সাঁকো। অথচ এই ব্রিজ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা পুরোপুরি তুলে নিয়েছে সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজের ভাই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলামের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইফতি ইটিসিএল’। শুধু এই একটি কাজই নয়, নাজিরপুর-বৈঠাকাটা ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ৪৪ কোটি টাকার কার্যাদেশও পেয়েছিল একই প্রতিষ্ঠান। অথচ সেখানেও কোনো কাজ না করেই পুরো টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পিরোজপুরে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে সংঘবদ্ধ লুটপাটের ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছর থেকে পরবর্তী চার বছরে জেলায় মোট ৩,৫৫৮.৯২ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই বিপুল বরাদ্দের একটি বড় অংশই সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, তার পরিবারের ৫ সদস্য এবং সরকারি দপ্তরের ২২ জন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে লুটপাট করা হয়েছে। লুটপাটের এই চক্রে পিরোজপুর এলজিইডি’র সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুস সাত্তারসহ ঢাকা ও বরিশাল অফিসের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মীরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮টি প্রকল্পের তদন্ত করে প্রায় ১,০৭৩ কোটি টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক এমপি মহিউদ্দিন মহারাজসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, মিরাজুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন ৮টি ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে এসব প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়া, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব তোফাজ্জেল হোসেন মিয়ার প্রভাব খাটিয়ে মহারাজ জেলায় লুটপাটের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জেলার সাত উপজেলায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা পাকা করার ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই প্রায় ৯১ কোটি টাকা তুলে নেয়া হয়েছে। অথচ কাগজে-কলমে প্রকল্পের ৭৭ শতাংশ অগ্রগতি দেখানো হয়েছিল। ২০২১ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের জুন মাসে। সরেজমিন পরিদর্শনে ভাণ্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভাণ্ডারিয়া মন্ত্রী বাড়ি রোড পর্যন্ত বিসি রাস্তা ও তিনটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি, অথচ এর বিপরীতে ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিল পাস করা হয়েছে। একইভাবে মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া বর্ডার রোডে ১২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের নামে ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাউখালী ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব বিল পাস করার সময় কোনো প্রয়োজনীয় দস্তাবেজ বা মেজারমেন্ট বুকে সই নেয়া হয়নি। জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় ও হিসাবরক্ষণ অফিসের যোগসাজশে সরাসরি জালিয়াতির মাধ্যমে এই বিলগুলো ছাড় করা হয়েছে। এই ব্যাপক অনিয়মের কারণে বর্তমানে জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে এলজিইডি পিরোজপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, যেসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে সেগুলো আগের আমলের। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন সময়ে কোনো নিয়মই মানা হয়নি, যার ফলে এখন অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি আরও জানান, অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং নতুন করে বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় সাধারণ মানুষ চরম জনদুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন বলে তিনি স্বীকার করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় বরিশাল বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ শীর্ষক প্রকল্প থেকে ৪টি প্যাকেজে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণের কার্যাদেশ পায় একই প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বশেষ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ১৭টি প্রকল্পের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮টি প্রকল্পের তদন্তে প্রায় এক হাজার ৭৩ কোটি টাকা দুর্নীতির সত্যতা পায় এবং এর সঙ্গে জড়িত মহারাজের পরিবারের ৫ জনসহ এলজিইডি ও পিরোজপুর। 73, 5, 27. প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আসামিদের ৫ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২০-২০২১ থেকে পরবর্তী ৪টি অর্থবছরে ১৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে পিরোজপুরে ১ হাজার ৮১০ টি স্কিমের জন্য ৩,৫৫৮.৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কাজগুলো থেকে ১,৬৪৭.৪৮ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে ৮টি প্রকল্পে তদন্ত শেষে প্রায় এক হাজার ৭৯ কোটি টাকা দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক।
সূত্র: মানবজমিন






























