তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং ২৭ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে পালাউতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের (পিআইএফ) নেতাদের সম্মেলনে যোগ দেন। এই বার্ষিক সম্মেলনে তাইওয়ান ও চীনের উপস্থিতি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে সব বহিরাগত অংশীদারদের বাদ দেওয়ার পর এবার তাইওয়ান ও চীন উভয়ই সম্মেলনে ফিরেছে। তবে বেইজিং এই অংশগ্রহণে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। চীনের বিশেষ দূত তাইওয়ানের অংশগ্রহণকে 'অত্যন্ত অনুপযুক্ত' হিসেবে অভিহিত করে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এর পরিণাম ভোগ করতে হবে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিদেশি হস্তক্ষেপের গুঞ্জনের মধ্যেই চীন ও তাইওয়ানের মধ্যকার এই প্রতিযোগিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত কোনো দেশ তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, তবে বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগের এই প্রক্রিয়া ২০২৪ সালে নাউরু সম্পর্ক পরিবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পদ্ধতিগত ও তীব্র। চীনের 'ওয়ান চায়না' নীতির মূল কথা হলো তাইওয়ান চীনের অংশ। এই নীতি বজায় রাখতে বেইজিং তাইওয়ানের আন্তর্জাতিক পরিধি সীমিত করার জন্য ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, তাইওয়ান তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কূটনৈতিক উপস্থিতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
চীনের কৌশল কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিং চায় বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো যেন বারবার তাদের 'ওয়ান চায়না' নীতির প্রতি সমর্থন জানায়। দ অ্যালায়েন্স ফিউচারস ইনিশিয়েটিভের তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা নয়টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশে চীনের কূটনীতিকদের সঙ্গে প্রতি তিনটি বৈঠকের একটিতে বেইজিংয়ের নীতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় চীন স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ বৃদ্ধি করেছে। জুলাই মাসে ফিজির পিপলস অ্যালায়েন্স পার্টির একটি প্রতিনিধি দল চীনে গিয়ে 'ওয়ান চায়না' নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। একই মাসে সলোমন দ্বীপপুঞ্জের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও চীনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধিরা বৈঠক করেছেন।
এই ধরনের সমর্থন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সরকারি সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ভানুয়াতুর বিরোধী দলের নেতা পিআইএফ সম্মেলনের আগেই সরকারকে 'ওয়ান চায়না' নীতির প্রতি অটল থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পাপুয়া নিউ গিনির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। জুলাই মাসে দেশটি তাইওয়ানের বাণিজ্য কার্যালয় বন্ধ করে দেয়। প্রধানমন্ত্রী জেমস ম্যারাপে বিদেশি চাপের কথা অস্বীকার করলেও, বাণিজ্যমন্ত্রী রিচার্ড মারু মে ২০২৬ সালে সরাসরি চীনা অর্থনৈতিক সুবিধার সঙ্গে ২০২৩ সালে তাইপেইতে পাপুয়া নিউ গিনির বাণিজ্য কার্যালয় বন্ধের সম্পর্ক স্বীকার করেছেন।
চীনের এই তৎপরতা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় গণমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে। মাইক্রোনেশিয়া ও ফিজিতে চীনের মিশন প্রধানরা স্থানীয় সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখে পাপুয়া নিউ গিনির উদাহরণ টেনে 'ওয়ান চায়না' নীতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। ফিজিতে চীনের চার্জ ডি'অ্যাফেয়ার্স ওয়াং ইউয়ান তার এক নিবন্ধে ফিজির সরকারকে চীনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার পরোক্ষ বার্তা দিয়েছেন।
অন্যান্য দেশগুলোও বেইজিংয়ের সন্তুষ্টি অর্জনে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। নাউরুর মন্ত্রিসভা সরকারি কর্মচারীদের জন্য 'ওয়ান চায়না' নীতি মেনে চলার নির্দেশ জারি করেছে। কিরিবাতির প্রেসিডেন্ট তানেতি মামাউ এমন একটি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব করেছেন যা ভবিষ্যতে তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পথ বন্ধ করে দেবে। এই সব ঘটনাপ্রবাহ এটাই প্রমাণ করে যে, বেইজিংয়ের লক্ষ্য কেবল স্বীকৃতি আদায় নয়, বরং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাইওয়ানের উপস্থিতি পুরোপুরি মুছে ফেলা। আপনি এই মাসে ২টি ফ্রি নিবন্ধ পড়ার সীমা অতিক্রম করেছেন।



























