র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন নামে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের উদ্যোগকে ‘একই বাহিনী নতুন মোড়কে’ ফিরিয়ে আনার ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, সংসদে উত্থাপিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এ নতুন এই বাহিনীকে যে ধরনের অস্পষ্ট ও ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
রবিবার এক বিবৃতিতে টিআইবি এই উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটি জানায়, প্রস্তাবিত বিলে অস্ত্র ও বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগ এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা না থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, র্যাব বিলুপ্তির নীতিগত সিদ্ধান্তটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এবং ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য কেবল একটি বাহিনীর নাম পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হলে নতুন বাহিনীর কাঠামো, জনবল, ক্ষমতা এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনা জরুরি। অন্যথায় এটি কেবল পুরোনো প্রতিষ্ঠানের খোলস পরিবর্তন বা একটি ‘কসমেটিক মেকওভার’ হবে, যা দেশের নাগরিক বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।
বিবৃতিতে টিআইবি পুলিশ বাহিনীর বাইরে সশস্ত্র বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে এসআরবিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, এমন সুযোগ থাকলে অভ্যন্তরীণ পুলিশingয়ে সামরিক যুদ্ধকৌশল ব্যবহারের ঝুঁকি থেকে যায়, যা প্রতিপক্ষকে নির্মূল বা হত্যার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে র্যাবের বর্তমান জনবলকে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঢালাইভাবে নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে টিআইবি। সংস্থাটি দাবি করেছে, জাতিসংঘের সিকিউরিটি সেক্টর রিফর্ম (এসএসআর) ও ডিডিআর মানদণ্ড অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘ভেটিং’ বা যাচাই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে, র্যাবে কর্মরত থাকাকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম বা নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত কোনো সদস্য যেন কোনোভাবেই এসআরবিতে যুক্ত হতে না পারেন।
প্রস্তাবিত বিলে এসআরবিকে গোয়েন্দা নজরদারি, অভিযান, তল্লাশি ও সাধারণ তদন্তের মতো বহুমুখী ক্ষমতা দেওয়ার সমালোচনা করেছে টিআইবি। বিশেষ করে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা’ এবং ‘সরকার কর্তৃক নির্দেশিত অন্যান্য দায়িত্ব’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধের ব্যবহারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিন্নমত দমন ও বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। এর ফলে অতীতের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনি বৈধতা পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন ইফতেখারুজ্জামান।
তাছাড়া, পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের সুযোগ এবং বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদকক্ষ রাখার বিধানকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর) এবং দেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
বিলের ২২ ধারায় প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটির সমালোচনা করে টিআইবি বলেছে, এসআরবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত এই কমিটি নিরপেক্ষ হতে পারে না। নিজের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিজেরা তদন্ত করলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। এর পরিবর্তে পুলিশ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তদারকি কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করেছে টিআইবি, যেখানে মানবাধিকার ও আইনবিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এছাড়া অভিযোগ তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার বিলে যুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
টিআইবি মনে করে, র্যাব বিলুপ্তির মূল উদ্দেশ্য সফল করতে হলে ক্ষমতার স্পষ্ট সীমারেখা, স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছ সদস্য যাচাইপ্রক্রিয়া ও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু নাম পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। ইতিমধ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’-এর ধারা-ওয়ারি বিশ্লেষণ ও সুপারিশসহ একটি বিস্তারিত পলিসি ব্রিফ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠিয়েছে টিআইবি।




























