স্পেনে চার দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটার পর যখন গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটছিল, ঠিক তখনই চরম ঝুঁকি নিয়ে দেশটির প্রথম ট্রান্সজেন্ডার রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল। ১৯৭৮ সালে বার্সেলোনায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই সংগঠনটির নাম ছিল 'কোলেকতিভো দে ত্রাবেস্তিস ই ত্রানসেক্সুয়ালেস' (কালেক্টিভ অব ট্রান্সভেস্টিস অ্যান্ড ট্রান্সসেক্সুয়ালস)। সম্প্রতি কিংস কলেজ লন্ডনের পিএইচডি গবেষক ইয়াগো মোরার দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে করা এক গবেষণায় এই সাহসী দলটির ইতিহাস উঠে এসেছে।
১৯৭৫ সালে একনায়ক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর স্পেনে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তন চলছিল, তখন এই সংগঠনের সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বৈঠকে মিলিত হতেন। প্রায় ২০ জন সদস্যের এই দলটি সিভিল রেজিস্ট্রিতে লিঙ্গ স্বীকৃতির মতো মৌলিক অধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হুয়ান মার্তিনেজ-খিল জানান, ফ্রাঙ্কো আমলের কঠোর আইনগুলো সেসময়ও বহাল থাকায় এই আন্দোলনের পেছনে ছিল চরম গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঝুঁকি। ফ্রাঙ্কো স্বৈরশাসনের সময় হাজার হাজার এলজিবিটিকিউ+ মানুষকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল বা জোরপূর্বক বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল।
গবেষক ইয়াগো মোরা জানান, সেসময়কার মানুষ ১৯৭৮ সালে এমন একটি সংগঠনের অস্তিত্ব দেখে অবাক হয়েছিল। কারণ তারা কেবল গোপনে বৈঠকই করতেন না, বরং রাজপথে নেমে নিজেদের 'ট্রান্সসেক্সুয়াল' ও 'ত্রাবেস্তিস' হিসেবে পরিচয় দিয়ে ব্যানার হাতে বিক্ষোভ করতেন। ক্যাথলিক চার্চের মনোভাব এবং তাদের পণ্য হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র সমালোচনা করতেন তারা। সেসময় ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা তীব্র বৈষম্যের শিকার হতেন এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। মার্তিনেজ-খিলের মতে, ট্রান্স নারীদের মূলত বিনোদন জগত বা পতিতাবৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হতো। তাই মোরা এই আন্দোলনের রাজনৈতিক সক্রিয়তার যে নতুন দিকটি সামনে এনেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপের ইতিহাসে ১৯৭২ সালে যুক্তরাজ্যে গঠিত হওয়া 'জিএলএফ ট্রান্সভেস্টিট, ট্রান্সসেক্সুয়াল অ্যান্ড ড্র্যাগ কুইন' গ্রুপের পাশাপাশি স্পেনের এই সংগঠনটিকে অত্যন্ত যুগান্তকারী ও অগ্রগামী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সমকামিতা-বিরোধী আইনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর মঞ্চের অধীনে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে প্রায় দুই বছর সক্রিয় ছিল এই কালেক্টিভ। পরবর্তীতে গণতন্ত্রের সুসংহতকরণ এবং সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়ার পর আন্দোলনের গতি কমে যায়। অনেকেই মনে করেছিলেন মূল লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, যার ফলে ছোট এই দলটির প্রতি মিত্রদের সমর্থন কমে আসে। তবে স্পেনে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত 'পাবলিক স্ক্যান্ডাল' বা প্রকাশ্য কেলেঙ্কারির আইন বহাল থাকায় আশির দশকেও ট্রান্সজেন্ডারদের ওপর পুলিশি হয়রানি ও সামাজিক বর্জন অব্যাহত ছিল।
এই আন্দোলনের প্রায় ৩০ বছর পর, ২০০৭ সালে স্পেনে প্রথমবারের মতো কঠোর শর্তসাপেক্ষে সরকারি পরিচয়পত্রে লিঙ্গ পরিবর্তনের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। গবেষক মোরা উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে অনেকেই ট্রান্সজেন্ডার বিষয়টিকে আধুনিক যুগের আবিষ্কার বলে প্রচার করতে চান, কিন্তু এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে তারা দীর্ঘ সময় ধরে অস্তিত্বশীল ছিলেন এবং বর্তমানের মতোই অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে গেছেন।































