জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন পলাতক ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যারা আত্মনিয়োগ করেছিলেন, সেই মুক্তিকামী জনগণের কাছে ৫ আগস্ট একটি অবিস্মরণীয় বিজয়ের দিন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক।
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বিএনপির নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই সময় থেকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে, সব ভেদাভেদ ছাপিয়ে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি শক্তির একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠেছিল—তারা বাংলাদেশের পক্ষে। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছিল ‘ফ্যাসিবাদ বনাম বাংলাদেশ’ এক নতুন মেরুকরণ। তিনি উল্লেখ করেন, আজ দুই বছর পূর্তিতে সেই ঐক্যের মাঝে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব দৃশ্যমান। আমাদের নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক বা ইতিবাচক সমালোচনা থাকতে পারে, তবে কোনো ধরনের অশালীন আচরণ না করেও একে অপরকে প্রশ্ন করা যায় এবং প্রজ্ঞা ও ইতিবাচকতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। ভিন্নমতকে ধারণ করেই পলাতক ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনবদ্য অধ্যায়। এই অভ্যুত্থানে সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, নারী, প্রবাসী, কৃষক, পোশাকশ্রমিকসহ সকল পেশাজীবী মানুষ দল-মত-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এটি ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বাকস্বাধীনতা হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের মতো দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা। ফ্যাসিস্ট সরকার এই গণজোয়ার দমাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতম ব্যবহার করেছে। মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানো হয়েছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি বর্ষণ করা হয়েছে। সেই গণহত্যার নির্মমতা সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে এবং জাতিসংঘের রিপোর্টেও উঠে এসেছে। রংপুরের শহিদ আবু সাঈদ কীভাবে বুক চিতিয়ে ফ্যাসিস্টের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েছিলেন এবং চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা শহিদ ওয়াসিম আকরাম যেভাবে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।
উপদেষ্টা জানান, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ শহিদ হয়েছেন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শত-শত মানুষ স্থায়ীভাবে অঙ্গহানি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এখনো অনেক পরিবার তাদের স্বজন খুঁজে বেড়াচ্ছেন এবং অনেক সহযোদ্ধা হাসপাতালে কিংবা বাড়িতে আঘাতের ব্যথা নিয়ে কাতরাচ্ছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য যদি কেউ প্রতিযোগিতায় নামে, তা আমাদের পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। বারবার ১৯৭১ বা ২০২৪ সালের জুলাই আসবে না, তবে একাত্তর ও চব্বিশের পাশাপাশি নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ সকল সংগ্রামকে ধারণ করে জাতি আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ নির্ণয় করবে।
মাহ্দী আমিন আরও বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহিদ পরিবার ও আহতদের পাশে সরকার আন্তরিকভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন্তা, রূপকল্প ও দেশ পুনর্গঠন কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ ধারণ করে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার শহিদদের কাঙ্ক্ষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। বিগত সময়ের মানবাধিকার লংঘনের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


























