ওজেম্পিকের মতো ওজন কমানোর ওষুধের ব্যাপক ব্যবহার এবং প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার এই যুগে মানুষের শারীরিক গঠন নিয়ে কথা বলাটা অত্যন্ত জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অ্যারিয়ানা গ্রান্ডের মতো তারকাদের নিয়ে সাম্প্রতিক মিডিয়া কাভারেজ থেকেই স্পষ্ট যে, অন্যের শরীর নিয়ে কীভাবে কথা বলা উচিত, তা নিয়ে জনমনে এক ধরনের দ্বিধা রয়েছে।
মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের সেন্টার ফর ইটিং অ্যান্ড ওয়েট ডিজঅর্ডারস-এর পরিচালক ড. টম হিল্ডেব্র্যান্ডের মতে, বর্তমানে সমাজ এক ধরনের চরম দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১০-এর দশকে 'বডি পজিটিভিটি' আন্দোলনের মাধ্যমে সব ধরনের শারীরিক গঠনকে গ্রহণ করার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, তা জিএলপি-১ (GLP-1) জাতীয় ওষুধের উত্থানের ফলে উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। এখন মিডিয়া আবারও ওজন কমানোর বিষয়টিকে আদর্শায়িত করে তুলছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের ইটিং ডিজঅর্ডার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. উলরিকে শ্মিডট জানান, বর্তমানে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে শরীরের 'অপ্টিমাইজেশন' বা রূপান্তর। সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণার কারণে এই ধরনের আলোচনা থেকে দূরে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ন্যাশনাল ইটিং ডিজঅর্ডারস অ্যাসোসিয়েশন (নেডা)-এর সিইও জেসিকা শিয়ার বলেন, ইন্টারনেটে শরীর নিয়ে অধিকাংশ মন্তব্যই অনুমাননির্ভর এবং ক্ষতিকর।
ড. হিল্ডেব্র্যান্ডের মতে, যেকোনো মন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের চেম্বারে যা প্রাসঙ্গিক, সোশ্যাল মিডিয়ায় তা সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় ভিন্ন রূপ ধারণ করে। অনেক মানুষই তাদের শারীরিক গঠন নিয়ে অসন্তুষ্ট। অস্ট্রেলিয়ার বাটারফ্লাই ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ তরুণ তাদের শারীরিক গঠন নিয়ে অসন্তুষ্ট এবং ৪৯ শতাংশের ক্ষেত্রে এই অসন্তুষ্টি স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
ড. শ্মিডট সতর্ক করে বলেন, আপাতদৃষ্টিতে নিরপরাধ মনে হওয়া প্রশংসাসূচক মন্তব্যও অনেক সময় ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক রোগীই জানান, তাদের ইটিং ডিজঅর্ডারের যাত্রা শুরু হয়েছিল শরীর নিয়ে করা ছোটখাটো মন্তব্য থেকেই। প্রশংসা বা সমালোচনা—উভয়ই তাদের মনে এই ধারণা তৈরি করে যে, নির্দিষ্ট ওজন বা শারীরিক গঠন না থাকলে তারা গ্রহণযোগ্য বা আকর্ষণীয় নয়।
বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে শরীর নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। অপরিচিত কেউ শরীর নিয়ে আলোচনা শুরু করলে তাতে অংশ না নিয়ে বিষয় পরিবর্তনের পরামর্শ দেন ড. হিল্ডেব্র্যান্ড। তার মতে, শরীর নিয়ে আলোচনা অনেক সময় আবহাওয়ার আলোচনার মতো একটি অর্থহীন সামাজিক অভ্যাস। অন্যদিকে, শিশু যদি নিজের বা অন্যের শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে, তবে তাকে প্রশ্ন করতে হবে, কেন সে এমনটি ভাবছে। এটি বুলিং বা বড়দের অনুকরণ হতে পারে।
বয়স্ক আত্মীয়দের ক্ষেত্রেও ভাষার ভিন্নতা থাকে। তাদের ওজন কমানোর মন্তব্য অনেক সময় উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে, যা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বোঝার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় শরীর নিয়ে কোনো বিতর্ক বা আলোচনার ক্ষেত্রে মন্তব্য না করাই শ্রেয়। আর যদি কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের শারীরিক গঠন বা ইটিং ডিজঅর্ডার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তবে সরাসরি এবং সহমর্মিতার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ক্ষেত্রে শরীরের চেয়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা মস্তিষ্কের ক্লান্তি (ব্রেন ফগ)-এর মতো বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া বেশি কার্যকর।































