কানাডার পশ্চিমাঞ্চলের একটি হ্রদে হঠাৎ ভেসে ওঠা একটি রহস্যময় বনের দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমী ও বিশেষজ্ঞদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্রায় ১৫০ মিটার (৫০০ ফুট) দীর্ঘ এবং ৭৫ মিটার (২৫০ ফুট) চওড়া এই ভূখণ্ডটি কোনো মানচিত্র বা নৌ-চলাচলের তালিকায় ছিল না। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার উইলিস্টন লেকে হঠাৎ দেখা দেওয়ার পর দ্বীপটি কয়েক দিনের জন্য উধাও হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আগের স্থান থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে পুনরায় এটির দেখা মেলে।
জলাশয়টিতে চলাচলকারী একজন বোটচালক প্রথম এই দ্বীপটির সন্ধান পান এবং একটি ভিডিও ধারণ করেন। ভিডিওতে দেখা যায়, হ্রদের ঢেউয়ের তালে তালে দ্বীপের প্রায় ১০০টি গাছ দুলছে। এই রহস্যময় ঘটনার কেন্দ্রস্থল উইলিস্টন লেক মূলত একটি বিশাল কৃত্রিম জলাধার, যা ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ডব্লিউ. এ. সি. বেনেট বাঁধ (W.A.C Bennett dam) নির্মাণের ফলে সৃষ্ট হয়েছিল। প্রায় ১,৭০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জলাশয়টি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় স্বাদু পানির আধার।
জলাধার ও বাঁধ পরিচালনাকারী সরকারি সংস্থা ‘বিসি হাইড্রো’ (BC Hydro)-এর মুখপাত্র বব গ্যামার প্রথম যখন এই দ্বীপের ছবি দেখেন, তখন এটিকে অত্যন্ত অবিশ্বাস্য বলে মনে করেছিলেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর এই যুগে এমন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণের প্রয়োজন ছিল, যা পরবর্তীতে পাওয়া গেছে। এরপর স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমেও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বাঁধ থেকে প্রায় ৬০ মাইল পশ্চিমে জলাধারের মূল অংশে একটি আস্ত বন ভেসে বেড়াচ্ছে।
বিসি হাইড্রো মনে করছে, জলাধারের শান্ত ও সুরক্ষিত তীরের কাঠের অবশিষ্টাংশের ওপর বছরের পর বছর ধরে গাছপালা ও লতাগুল্ম জন্মে এই দ্বীপটির সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ১২,০০০ বর্গমিটার (১৪,০০০ বর্গগজ) আয়তনের এই ভাসমান দ্বীপটি এখন জীবনের স্পন্দনে ভরপুর। এখানে পাইন জাতীয় এবং চওড়া পাতার গাছের পাশাপাশি পাখি ও ছোট ছোট প্রাণী বসবাস করছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, পানির নিচে থাকা এই দ্বীপের শিকড়গুলোর আশপাশে প্রচুর মাছের সমাগম ঘটেছে।
দ্বীপের গাছগুলোর বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ‘হাইড্রোপ্রোনিক্স’ বা মাটি ছাড়া পানিতে চাষাবাদের সাথে তুলনা করেছেন বব গ্যামার। তিনি বলেন, প্রচুর পানি এবং পচনশীল পুষ্টি উপাদান পাওয়ায় গাছগুলো খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠেছে। তিনি আরও জানান, শীতকালীন ভারী তুষারপাত এবং গ্রীষ্মের অবিরাম বৃষ্টির কারণে পিস রিভার ও হ্রদের পানির স্তর গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই অনুকূল পরিস্থিতির কারণেই হয়তো দ্বীপটি তার আগের স্থান থেকে ভেসে উন্মুক্ত পানিতে চলে এসেছে।
মাঝখানে দ্বীপটি উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়ে গ্যামার ব্যাখ্যা করেন, এটি হ্রদের তলদেশে তলিয়ে যায়নি, বরং ভাসতে ভাসতে তীরের কোনো সুরক্ষিত বা আড়ালে থাকা অংশে চলে গিয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, দ্বীপের গাছগুলো কয়েক দশকের পুরোনো হতে পারে। তবে গ্যামার সতর্ক করে বলেন, ভিডিওতে দেখা গেছে গাছগুলো কাঠের একটি অত্যন্ত পাতলা ও নাজুক স্তরের ওপর দাঁড়িয়ে দুলছে। তাই কৌতূহলী হয়ে কেউ যেন এই দ্বীপে পা রাখার চেষ্টা না করেন, কারণ এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অস্থিতিশীল।
বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তেও এমন ভাসমান দ্বীপের দেখা মিলেছে, যার মধ্যে উইসকনসিনের বিখ্যাত ‘ফোর্টি একর বগ’ অন্যতম। চিপেওয়া লেকে অবস্থিত সেই বিশাল দ্বীপটি পিট কয়লা, কাদা, শিকড় ও গাছের সমন্বয়ে গঠিত।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দা রকি অ্যাভেরি প্রথম এই দ্বীপের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছিলেন যাতে নৌযান চালকরা সতর্ক থাকতে পারেন। তিনি রসিকতা করে বলেন, সুযোগ থাকলে তিনি অবশ্যই এই দ্বীপে লাফিয়ে পড়তেন। তার এই পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং কানাডার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে অনেকে মন্তব্য করছেন। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের পর ‘লেক অন্টারিও’-এর নাম পরিবর্তন করার ঘোষণা দিলে কানাডার নাগরিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উপহাসের সৃষ্টি হয়। অ্যাভেরির পোস্টে মন্তব্য করে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, "আমি অবাক হব না যদি ট্রাম্প এই দ্বীপটিরও নিজের নামে দাবি করে বসেন।"





























