স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউটায় সৃষ্ট অভিবাসী সংকটকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত নেটওয়ার্কগুলো অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ। তাঁর দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিষয়ে মাদ্রিদের সাহসী অবস্থানের প্রতিশোধ নিতেই দেশ দুটি এই সংকটকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
গত ৩০ ও ৩১ জুলাই উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে ৭২,০০০-এরও বেশি অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা চালান। স্পেনের জাতীয় সংবাদ সংস্থা ইএফই-এর তথ্য অনুযায়ী, এই গণ-সীমান্ত পারাপারের চেষ্টাকালে অন্তত ৭০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
অনুপ্রবেশকারীদের অধিকাংশকেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হলেও, আগস্টের শেষ নাগাদ সিউটায় প্রায় ৫,০০০ অভিবাসী থেকে যান, যাদের মধ্যে ১,২০০ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
সোমবার স্প্যানিশ রেডিও নেটওয়ার্ক ‘কাদেনা এসইআর’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সানচেজ বলেন, “৩০ ও ৩১ জুলাইয়ের পর রাশিয়া, ইসরায়েল এবং আন্তর্জাতিক উগ্র-ডানপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো থেকে বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো হয়েছে। এই উগ্র-ডানপন্থীরা সবসময়ই অভিবাসন ইস্যুকে কেবল স্পেনের ওপর নয়, বরং ইউরোপের ওপর হামলা চালাতে এবং একে বিভক্ত করতে ব্যবহার করে।”
তিনি জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক শাখা ‘ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিস’-এর গবেষণায় ইসরায়েলি ও রুশ নেটওয়ার্কের এই সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে, তবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।
সানচেজ আরও বলেন, রাশিয়া বা ইসরায়েল যদি এই ইস্যুতে স্প্যানিশ সরকারের সমালোচনা করে অপপ্রচার চালায়, তবে তা স্পেনে বা ইউরোপের অভিবাসন নিয়ে তাদের উদ্বেগের কারণে নয়। বরং গাজায় গণহত্যা এবং ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পেনের নেওয়া সাহসী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তারা এমনটি করছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই স্পেন কিয়েভকে জোরালো সমর্থন দিয়ে আসছে।
পাশাপাশি গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধেও ইউরোপের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক পেড্রো সানচেজ। গত মে মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি হামাসের হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের চালানো ‘গণহত্যা’রও তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন।
সিউটার আধা-স্বায়ত্তশাসিত মেয়র-প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, এই অনুপ্রবেশের ঘটনা মরক্কো সরকার কর্তৃক উৎসাহিত বা অনুমোদিত হতে পারে। তবে সানচেজ মরক্কোর এই সংশ্লিষ্টতার গুঞ্জন পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, অভিবাসন বিষয়ে মরক্কোর সঙ্গে স্পেনের সহযোগিতা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং এই সংকট কেবল পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। অন্যদিকে, মরক্কোর এক কর্মকর্তাও এই হঠাৎ অনুপ্রবেশের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার ও অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোকে দায়ী করেছেন।
সানচেজের এই অভিযোগের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে সানচেজের বক্তব্যকে “লজ্জাহীন মিথ্যা” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ নির্লজ্জভাবে মিথ্যা বলছেন। সিউটার ঘটনা নিয়ে ইসরায়েল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলে তিনি যে অভিযোগ করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যাননও গত ৩০ জুলাই এক্স-এ লেখেন, “স্পেন, যারা ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার কোনো সুযোগ হাতছাড়া করে না, তারা তাদের নিজস্ব অভিবাসন নীতির সংকটের কারণে সিউটায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। আমাদের উপদেশ দেওয়ার আগে তাদের বিশ্বকে ব্যাখ্যা করা উচিত কেন তারা এখনও আফ্রিকায় উপনিবেশ বজায় রেখেছে।”
রাশিয়ার স্বাধীন সংবাদপত্র আরবিসি এবং স্প্যানিশ সংবাদ সংস্থা ‘ইউরোপ প্রেস’ ক্রেমলিনের বেনামী কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, মস্কোও সানচেজের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এদিকে সিউটা সীমান্তে এই ব্যাপক অনুপ্রবেশের ঘটনা পুরো ইউরোপ জুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ১ আগস্ট, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ২২টি দেশের নেতারা একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে ইউরোপীয় দেশগুলোর "কার্যকর করার দায়িত্ব"-এর কথা উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে স্পেনের সাম্প্রতিক বড় আকারের আইনি বৈধতা দেওয়ার কর্মসূচির পরোক্ষ সমালোচনা করে বলা হয়, এ ধরনের নীতি অবৈধ অভিবাসীদের আরও উৎসাহিত করতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে স্পেনের নেওয়া ওই বিশেষ ক্ষমার আওতায় প্রায় ১১ লাখ আবেদন জমা পড়ে, যেখানে প্রাথমিকভাবে ৫ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির সুবিধা পেতে আবেদনকারীদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকা এবং ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে থেকে স্পেনে বসবাসের প্রমাণ দেখাতে হবে। সানচেজ এই নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেন, অভিবাসীদের আইনি মর্যাদা দিলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজ গঠনে অবদান রাখবে।




























