চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো মিসর সফরে গেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই সফরটি দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার সাধারণ একটি সুযোগ মনে হলেও, এর পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। আমেরিকার প্রধান বিশ্ব প্রতিদ্বন্দ্বী চীন মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রধান মিত্র মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে চাইছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কায়রো বিমানবন্দরে পৌঁছান শি জিনপিং। এ সময় বিমানবন্দরটি চীন ও মিসরের জাতীয় পতাকায় সাজানো হয়েছিল। বিমানবন্দরে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং সামরিক গার্ডরা তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দিয়ে স্বাগত জানান। তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে বুধবার দুই নেতার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া শি জিনপিং গিজার পিরামিডের কাছে অবস্থিত গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম পরিদর্শন করবেন। ২০২২ সালে সৌদি আরব সফরের পর এটিই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে শি জিনপিংয়ের প্রথম সফর। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিসরের প্রেসিডেন্ট আল-সিসি একাধিকবার চীন সফর করেছেন।
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার মিসরের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদপত্রগুলোতে দুই নেতাই বন্ধুভাবাপন্ন নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। শি জিনপিং লিখেছেন, বেইজিং ও কায়রোর উচিত উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের 'ব্যবহারিক সহযোগিতার পরিধি আরও প্রসারিত করা।' অন্যদিকে, আল-সিসি মিসরে চীনের বিনিয়োগের প্রশংসা করেন এবং তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বেইজিংয়ের দাবির প্রতি কায়রোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
মিসর মূলত চীনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের কৌশলগত অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনতে চায়। ২০২৩ সালে মিসরকে ব্রিকস (BRICS) জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন জি৭-এর মতো প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। এর এক বছর পর, মিসর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (BRI) সাথে যুক্ত হতে চুক্তি স্বাক্ষর করে।
মিসরে চীন ইতিমধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, যার মাধ্যমে কায়রোর পূর্বে একটি ব্যবসায়িক হাব এবং নীল নদ বদ্বীপে শিল্পের জন্য একটি বৈদ্যুতিক রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও মিসরের মধ্যকার বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৫.৭ বিলিয়ন ডলার।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কার্নেগি মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের পরিচালক আমর হামজাভি এবং সাবেক ফেলো ক্যাথরিন সেলফ এক যৌথ প্রবন্ধে লিখেছেন, 'যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজের অবস্থান নিজেই দুর্বল করছে, তখন চীন তার সফট পাওয়ার বা নরম শক্তির ভাণ্ডার গড়ে তুলছে।' জাকার্তার সেন্টার অব ইকোনমিক অ্যান্ড ল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ জুলফিকার রাখমত বলেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় মিসরের নিয়ন্ত্রণাধীন সুয়েজ খাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে।
তাই এই সচল রুটের নিয়ন্ত্রণকারী দেশের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার ভালো কারণ রয়েছে চীনের। তিনি আরও যোগ করেন, শি জিনপিং মিসরকে বৃহত্তর আরব ও আফ্রিকান বিশ্বে পৌঁছানোর একটি ঘাঁটি হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ কিছুটা কমে এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। গত আগস্টে দুই দেশ মিসরের বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে যৌথ বিমান মহড়া পরিচালনা করে, যা ছিল চীনের জে-১৬ ফাইটার জেট এবং মিসরের ফরাসি নির্মিত রাফাল ফাইটার জেটের প্রথম যৌথ যুদ্ধ মহড়া। এছাড়া চীন নিজেকে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তুলে ধরছে।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে কথা বলে আসছে। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে শি জিনপিং ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে আতিথেয়তা দিয়েছিলেন এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সাথে একটি 'কৌশলগত অংশীদারিত্ব' ঘোষণা করেছিলেন।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ১০টি দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা জোট সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) দুই দিনের সম্মেলন শেষে কায়রো সফরে এলেন শি জিনপিং। এই জোটে রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইরানের নেতারা অংশ নেন। শি জিনপিংয়ের এই সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বৈশ্বিক আর্থিক সংযোগগুলোর ওপর তীব্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ইরানকে তার অর্থনৈতিক অংশীদারদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা, যার মধ্যে চীন অন্যতম। চীন ইরানের ৮০ শতাংশের বেশি তেল পরোক্ষ উপায়ে কিনে থাকে। বেইজিং অবশ্য জানিয়েছে যে ইরানের সাথে তাদের বাণিজ্য সবসময় আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে।





























