জার্মানির বার্লিনে সমকামীদের অধিকার রক্ষা বিষয়ক ‘প্রাইড প্যারেড’-এ গাড়ি নিয়ে হামলা চালানো সন্দেহভাজন ব্যক্তি পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন। বার্লিনের এক শহরতলীতে পুলিশের ওপর ছুরি নিয়ে চড়াও হলে পুলিশ গুলি চালায়, এতে ২১ বছর বয়সী ওই সন্দেহভাজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ডট সন্দেহভাজন ওই যুবকের নাম আবদুল বালুত বলে শনাক্ত করেছেন। তিনি লেবানিজ বংশোদ্ভূত একজন জার্মান নাগরিক। ডোব্রিন্ডট জানান, বালুত জার্মানিতেই জন্মগ্রহণ করেন এবং তার জন্মের তিন বছর আগে ২০০২ সালে তার মা জার্মানির নাগরিকত্ব পান। বালুত এর আগেও বার্লিনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন এবং তাকে ১ বছর ১০ মাসের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীদের মতে, বালুত ইসলামপন্থী চরমপন্থী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন এবং জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস-এ (ইসলামিক স্টেট) যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বার্লিনের প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে বালুত ইনস্টাগ্রামে আইএসের প্রোপাগান্ডা শেয়ার করেছিলেন। এরপর ২০২৫ সালে তিনি সিরিয়ায় গিয়ে আইএসে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে লেবানন ভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন মাসের জেল খাটেন। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে তিনি জার্মানিতে ফিরে আসেন এবং ২০২৬ সালের মে মাসে "গুরুতর সহিংসতা সৃষ্টির প্রস্তুতির" অভিযোগে পুনরায় গ্রেফতার হন। তবে আইএসের সাথে দূরত্ব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি এবং অপরাধ স্বীকার করায় আদালত তার সাজা স্থগিত করেছিল।
গত শনিবার বার্লিনের ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের কাছে প্রাইড ফেস্টিভ্যালের সমাপনী অনুষ্ঠানের কয়েক শ গজ দূরে এই হামলা ঘটে। একটি দ্রুতগতির গাড়ি সমবেত মানুষের ওপর তুলে দেওয়া হয়। এতে একজন নিহত হন এবং অন্তত ২৯ জন আহত হন। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, আটজন গুরুতর আহত এবং পাঁচজন সামান্য আঘাত পেয়েছেন। পুলিশ ধারণা করছে, বালুত হামলার জন্য ব্যবহৃত গাড়িটি ভাড়া করেছিলেন, তবে তিনিই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। হামলায় ব্যবহৃত ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটি দুর্ঘটনাস্থলেই পড়ে ছিল।
পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে এই হামলায় বালুত একা ছিলেন নাকি তার সাথে আরও কেউ জড়িত ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গাড়িটি থামার পর এক বা একাধিক ব্যক্তিকে সেটি থেকে নেমে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে। এছাড়া কিছু ভুক্তভোগীর শরীরে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডোব্রিন্ডট জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি একটি রামদা (ম্যাচেট) দিয়েও মানুষকে আঘাত করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ঘটনায় এক ইরানি নাগরিককে গ্রেফতার করা হলেও হামলায় তার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
এই ঘটনার পর জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সমকামী সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, "প্রাইড ইভেন্টে অংশ নেওয়া সবাইকে আমি বলতে চাই, আপনারা কেউ ভীত হবেন না। এই ধরনের হামলার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং আমাদের স্বাধীনতা ও উন্মুক্ততাকে কেড়ে নেওয়া।" হামলার পর শত শত মানুষ ব্র্যান্ডেনবার্গ গেটের স্মৃতিসৌধে জড়ো হয়ে ফুল, মোমবাতি এবং রংধনু পতাকা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে সমবেত জুলিয়ান মিথিগ নামে এক অংশগ্রহণকারী বলেন, "আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি অন্ধকার দিন।"
সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিতে এ ধরনের গাড়ি হামলার ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিবাসন, নিরাপত্তা ও চরমপন্থা নিয়ে বিতর্ক তীব্র করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মাগডেবার্গের ক্রিসমাস মার্কেটে গাড়ি হামলায় ৬ জন নিহত হন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিউনিখে ট্রেড ইউনিয়নের মিছিলে গাড়ি হামলায় এক নারী ও তার দুই বছরের মেয়ে মারা যান। এছাড়া ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মানহাইমে আরেকটি গাড়ি হামলায় ২ জন নিহত হন। এসব ধারাবাহিক হামলার কারণে জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থী দল 'অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি' (এএফডি)-এর সমর্থন বাড়ছে, যা চ্যান্সেলর মার্জ এবং মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চাপ বাড়াচ্ছে।





























