ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে। গত ১৫ জুলাই মন্ত্রিসভায় রদবদলের অংশ হিসেবে ফেদোরভকে পুনরায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জেলেনস্কি। এরপর থেকেই কিয়েভসহ দেশজুড়ে এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া চলছে। এমনকি রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্ক সাইরেনের মধ্যেও এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটেনি।
জেলেনস্কি ফেদোরভকে ফিরিয়ে আনতে একাধিক বিকল্প পদের প্রস্তাব দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাবেক এই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পুনরায় নিজের পদে বহাল হওয়ার দাবিতে অনড় রয়েছেন। সাবেক উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলিনা ফ্রোলোভা এ বিষয়ে বলেন, "আপনার অধীনে যদি কোনো মন্ত্রণালয় না থাকে, তবে আপনার কোনো বাজেট থাকবে না এবং কোনো কিছু করার প্রকৃত ক্ষমতাও থাকবে না।" ফেদোরভের এই অনড় অবস্থান এবং রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, ফেদোরভ কি নিজেকে জেলেনস্কির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছেন? একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বরখাস্ত হওয়ার মুহূর্ত থেকেই ফেদোরভ মূলত প্রেসিডেন্ট পদের একজন বাস্তব প্রতিযোগী হয়ে উঠেছেন।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে, যেখানে সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধকালীন কোনো নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ নেই, সেখানে এত আগে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিরোধী দলীয় এমপি ফেদোরভকে "শিশুসুলভ" আখ্যা দিয়ে বলেন, "তিনি নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়তে চাইছেন, যা এই পরিস্থিতিতে আমার কাছে চরম বোকামি মনে হয়।"
প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা অবশ্য দাবি করছেন যে, সংকট সমাধানে জেলেনস্কি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে, অজনপ্রিয় সামরিক কমান্ডার-ইন-চিফ ওলেক্সান্ডার সিরস্কিকে পরিবর্তন করে ৪৩ বছর বয়সী মেজর জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দ্রাপাতি ইউক্রেনের স্থলবাহিনীর একজন অত্যন্ত সম্মানিত সাবেক কমান্ডার। সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ইউরি সাক বলেন, "জেলেনস্কি ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করেছেন। তাই এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সুচিন্তিত। জেনারেল দ্রাপাতি একজন তরুণ, যুদ্ধ-প্রমাণিত ও আধুনিক জেনারেল, যিনি আমাদের প্রতিরক্ষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন বলে আশা করা যায়।"
দ্রাপাতের নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে নেওয়া হলেও এটি সংকটের আংশিক সমাধান মাত্র। ২০১৯ সালে তরুণ ও গতিশীল ভাবমূর্তি নিয়ে ক্ষমতায় আসা জেলেনস্কি এবার তরুণ ইউক্রেনীয়দের মনোভাব বুঝতে ভুল করেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জেলেনস্কির দল 'সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল'-এর এমপি ওলেক্সান্ডার মেরেঝকো বলেন, "মানুষ এমন কাউকে দেখতে চায় যিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়বেন, যিনি আধুনিক ও তরুণ। রাজনীতিকে মানুষ নোংরা ও কপট মনে করে, তাই সেখানে তারা একজন নায়ক খুঁজছেন।" মেরেঝকো রবার্ট গ্রিনের ১৯৯৮ সালের বই 'দ্য ৪৮ লজ অব পাওয়ার'-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "আপনার প্রভুকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।" তিনি মনে করেন, ফেদোরভের ক্ষমতা খর্ব করার লক্ষ্যেই এই রদবদল করা হয়েছিল, কিন্তু জেলেনস্কির এই কৌশল হিতে বিপরীত হয়েছে। মেরেঝকো বলেন, "তাকে অপসারণের ফলে বিপরীত ফল এসেছে। তার রেটিং হু হু করে বেড়ে গেছে।"
ফেদোরভের নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা নিয়ে কারও সন্দেহ না থাকলেও, তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। সমালোচকরা বলছেন, ফেদোরভ এমন একটি সময়ে দায়িত্ব পেয়েছিলেন যখন ইউক্রেন ইতিমধ্যেই নিজস্ব মাঝারি ও দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতা তৈরি করে ফেলেছিল, যাতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সরাসরি কোনো ভূমিকা ছিল না। একজন সাবেক ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, "কাজে তিনি যে শক্তি ও স্পষ্টতা এনেছিলেন তা প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু উদ্ভাবনের এই সংস্কৃতি কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না, এটি প্রায় ২,০০০ কোম্পানির সম্মিলিত প্রচেষ্টা।" নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিরোধী এমপি আরও স্পষ্টভাবে বলেন, "রাস্তায় নামা ৯৯ শতাংশ তরুণেরই ধারণা নেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা জেনারেল স্টাফ কীভাবে কাজ করে। তারা মনে করে ফেদোরভ ভালো কারণ তিনি ড্রোন দিয়ে যুদ্ধ করতে চান, আর সিরস্কি খারাপ ছিলেন কারণ তিনি যুদ্ধের জন্য মানুষ খুঁজছিলেন। এটি একটি চরম সরলীকরণ, যা সম্পূর্ণ ভুল।"
১২ বছর ধরে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে ক্লান্ত একটি দেশের মানুষের কাছে অবশ্য ড্রোন বা রোবট দিয়ে যুদ্ধ করার স্বপ্ন দেখাটাই স্বাভাবিক। তবে সবাই একমত যে, শীত আসার আগেই ইউক্রেনকে এই রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে হবে, কারণ শীতকালে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে রাশিয়ার বড় ধরনের হামলার আশঙ্কা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার টেলিগ্রামে জেলেনস্কি লিখেছেন, "শীতকাল কীভাবে পার করব, তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।"
রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রাজনৈতিক সংকটের কারণে জেলেনস্কির কর্তৃত্ব ও সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রণক্ষেত্রে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের দূরপাল্লার নিষেধাজ্ঞা অভিযান পুরোদমে চলছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, রণক্ষেত্রের প্রায় ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত "কিল জোন"-এর কারণে সম্মুখ যুদ্ধক্ষেত্র প্রায় স্থবির রয়েছে, যেখানে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও হামলা চালানো হচ্ছে। ইউক্রেনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধের কারণে চাপের মুখে থাকলেও দেশটির প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও অটুট। বিরোধী দলীয় এমপি আন্দ্রি ওসাদচুক বলেন, "ইউক্রেনের সাফল্যের রহস্য হলো আমরা উল্লম্ব কাঠামোর চেয়ে অনুভূমিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমি আশা করি এর ক্ষতি হবে ন্যূনতম।"




























