ভারতের খ্যাতনামা সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক অবশেষে তার ২৬ দিনব্যাপী অনশন ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছেন। নিট (NEET) প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষে এই অনশন শুরু হয়েছিল। যদিও শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের মূল দাবিটি এখনও পূরণ হয়নি, তবে এই অনশনটি ২০২১ সালের ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের পর প্রথমবার নরেন্দ্র মোদী সরকারকে বেশ বড় ধরনের ব্যাকফুটে ঠেলে দিয়েছে। মোদী সরকার নিট কেলেঙ্কারি ও তরুণদের বিক্ষোভ প্রশমনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেওয়ার পরই ওয়াংচুক বৃহস্পতিবার রাতে অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন। তবে নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে এখনও হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ বিক্ষোভকারী অবস্থান করছেন।
ওয়াংচুকের অনশন ভাঙার পর ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, ওয়াংচুকের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। তবে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ বা বরখাস্ত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে এবং ওয়াংচুকের এই বিশাল ত্যাগ তারা বৃথা যেতে দেবেন না। শুরুতে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ওয়াংচুক ও ককরোচ জনতা পার্টিকে নিয়ে কিছুটা সন্দিহান থাকলেও, পুলিশ জোরপূর্বক ওয়াংচুককে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর তারাও এই আন্দোলনে সরাসরি সংহতি জানায়।
আধুনিক যুগে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মাধ্যম হিসেবে অনশন ধর্মঘটের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। উনিশ শতকের শেষের দিকে জার শাসিত রাশিয়ায় বন্দিরা অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে প্রথম খাবার বর্জন শুরু করে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে কারাবন্দি নারী ভোটাধিকার কর্মীরা (সাফ্রেজেট) "রাজনৈতিক বন্দি" মর্যাদার দাবিতে অনশন করেন। সেখানে কারা কর্তৃপক্ষের জোরপূর্বক খাওয়ানোর চেষ্টা উল্টো জনমতকে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে নিয়ে যায়। আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীরাও কারাগারে অনশনকে হাতিয়ার করেছিলেন, যেখানে ৬৬ দিন অনশনের পর ববি স্যান্ডসের মৃত্যু ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি করেছিল।
ভারতে এই অনশন ধর্মঘটকে কারাগারের বাইরে সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলেন মোহনদাস করমচাঁদ "মহাত্মা" গান্ধী। ১৯১৮ সালে সুতা কল শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে প্রথম অনশন করে তিনি মালিকপক্ষকে দাবি মানতে বাধ্য করেন। এরপর থেকে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে গান্ধী অনশনকে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভগত সিং এবং যতীন দাসের মতো বিপ্লবী কর্মীরাও কারাগারে অনশন করেছিলেন। অনশনরত অবস্থায় যতীন দাসের মৃত্যু দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। তবে গান্ধীই প্রথম কারাগারের বাইরে এই পদ্ধতিকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলেন।
স্বাধীনতার পরও ভারতে অনশন বড় বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের অনুঘটক হয়েছে। ১৯৫২ সালে তেলেগুভাষী রাজ্যের দাবিতে পট্টি শ্রীরামুলুর ৫৮ দিনের অনশন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলেও, তার জেরে ১৯৫৩ সালে অন্ধ্র রাজ্য গঠিত হয়। এর ছয় দশক পর, ২০০৯ সালে কে চন্দ্রশেখর রাওয়ের আমরণ অনশন অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে পৃথক তেলেঙ্গানা রাজ্য গঠনে গতি আনে। তবে সব অনশন সফল হয়নি। মণিপুরের সমাজকর্মী ইরম শর্মিলা বিতর্কিত আফস্পা (AFSPA) আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দীর্ঘ ১৬ বছর অনশন করলেও তার লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। সরকারি হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাকে নাকে নল দিয়ে জোর করে খাওয়ানো হতো। ২০১৬ সালে তিনি অনশন ভেঙে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও পরাজিত হন।
অনশন ধর্মঘটের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই পদ্ধতি তখনই বড় প্রভাব ফেলে যখন এর দাবিগুলো সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত থাকে, দাবিগুলো সুনির্দিষ্ট হয় এবং অনশনকারী ব্যক্তির নিজস্ব সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা থাকে। ২০১৮ সালে পরিবেশবিদ গুরুদাস আগরওয়াল গঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করার দাবিতে ১১১ দিন অনশন করে মারা গেলেও গণমাধ্যম বা সরকার কেউই তার মৃত্যুর আগে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
অন্যদিকে, সোনম ওয়াংচুকের অনশন দ্রুত জনমনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়। গত ২৮ জুন দিল্লিতে শুরু হওয়া এই অনশন ১৬-১৭ জুলাইয়ের দিকে ব্যাপক আলোচনায় আসে, যখন জানা যায় অনশনের কারণে তার ওজন ৯ কেজির বেশি কমে গেছে। প্রথমত, নিট পরীক্ষার সংস্কার ও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি ইতিমধ্যেই একটি বড় জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কারজয়ী ওয়াংচুক একজন পরিচিত মুখ, যিনি গত বছর লাদাখ আন্দোলনের সময় ১৭০ দিন আটক ছিলেন। এছাড়া জনপ্রিয় বলিউড সিনেমা 'থ্রি ইডিয়টস'-এর একটি প্রধান চরিত্র তার জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় তার একটি সেলিব্রিটি ইমেজও রয়েছে।
এর আগে ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে দিল্লিতে সমাজকর্মী আন্না হাজারের অনশন তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছিল। আন্না হাজারে দেশজুড়ে ওয়াংচুকের মতো পরিচিত না হলেও কিরণ বেদি, প্রশান্ত ভূষণ ও মেধা পাটকরের মতো বিশিষ্টজনেরা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। দুর্নীতিবিরোধী সেই আন্দোলনকে আরএসএস পেছন থেকে পরিচালনা করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে ইউপিএ সরকারের পতনের পথ সুগম করে। ওয়াংচুকের অনশন এখন শেষ হলেও এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া আন্দোলনের গতি সহজে হারিয়ে যাবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

























