রাজধানীর শাহজাহানপুরে চলন্ত ট্রাকে অগ্নিসংযোগ ও চালকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন বিএনপির আট নেতাকর্মী। দীর্ঘ এই সময়ে মামলার বাদী কিংবা অভিযোগপত্রের ১৭ জন সাক্ষীর কেউই আদালতে এসে সাক্ষ্য দেননি। সাক্ষীদের হাজির করতে আদালত থেকে বারবার সমন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। অন্তত ২৬০ বার সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য হলেও প্রতিবারই রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে পিছিয়ে গেছে শুনানি। ফলে বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৯৯ সালের ২৫শে নভেম্বর। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির ডাকা হরতাল চলাকালে মতিঝিল থানার উত্তর শাহজাহানপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে একটি চলন্ত ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। ওই আগুনে দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ট্রাকচালক নওশাদ নসু। ঘটনার পর মতিঝিল থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে বিস্ফোরক ও হত্যা আইনে ২৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন, যার নম্বর ১৬৯। মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ দলটির নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত শেষ করতে পুলিশের সময় লাগে প্রায় তিন বছর। ২০০২ সালে আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রধান আসামি মির্জা আব্বাসসহ ২০ জনকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে বাকি আট আসামির বিরুদ্ধে বিচার চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তদন্ত শেষে একটি বড় অংশ বাদ পড়লেও এই আটজনের জন্য আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটেনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, অভিযোগপত্রে থাকা ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে রয়েছেন এসআই মাহবুবুর রহমান, এসআই ইসহাক মল্লিক, এসআই রফিকুল ইসলাম, এএসআই হারুনুর রশীদ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের লেকচারার ডা. মোস্তাক রহিমসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। তাদের আদালতে হাজির করতে একাধিকবার সমন এবং অনাপত্তিমূলক ও জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। কিন্তু কোনো পদক্ষেপই তাদের আদালতে হাজির করতে পারেনি। এমনকি ২০১৮ সালে মামলার বাদী তৎকালীন এসআই নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালত থেকে জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলেও তাকে আদালতে আনা সম্ভব হয়নি।
সাক্ষ্যগ্রহণের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলাটি এক আদালত থেকে অন্য আদালতে স্থানান্তরিত হয়েছে। ২০০২ সালের মার্চে মামলাটি প্রথমে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। এরপর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত হয়ে এটি স্থান পায় ঢাকার পরিবেশ আপিল আদালতে (বিশেষ দায়রা জজ আদালত)। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মামলাটি খারিজের জন্য আদালতে একাধিকবার আবেদন করেছেন। কিন্তু আদালত মামলা খারিজ না করে বারবার নতুন করে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট শাকিল আহমেদ রিপন এই বিচারপ্রক্রিয়াকে অমানবিক উল্লেখ করে বলেন, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক মামলা ছিল। হরতালে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় পুলিশ পরিকল্পিতভাবে বিএনপি নেতাদের আসামি করে। মামলার সরকারি সাক্ষীদের কেউই আদালতে আসেননি, অথচ আসামিরা দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আমরা বারবার মামলাটি খারিজের আবেদন করলেও আদালত শুধু নতুন তারিখ দিয়ে যাচ্ছেন।
আরেক আইনজীবী এডভোকেট জয়নাল আবেদীন মিসবাহ বলেন, হরতালের সময় তৎকালীন বাদীর ওপর রাজনৈতিক চাপ থাকায় বিএনপি নেতাদের ফাঁসাতে এই সাজানো মামলাটি দেওয়া হয়েছিল। যেখানে তদন্ত কর্মকর্তা, সাক্ষী বা মেডিকেল অফিসার কাউকেই আদালতে আনা যাচ্ছে না, সেখানে এই মামলা ঝুলিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আসামিরা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমরা এখন এই মামলার বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।































