হাসপাতালে কর্মরত একজন নিউরোসার্জারি কোঅর্ডিনেটর নিজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, অথচ প্রথম দিকে তিনি বুঝতেই পারেননি তাঁর শরীরে কী ঘটছে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা এবং চিকিৎসকদের মতামত থেকে স্পষ্ট যে, নারীদের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ পুরুষদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা হতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের (এএইচএ) তথ্য অনুযায়ী, নারীদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হৃদরোগ, যা প্রতি বছর ক্যানসারের সব রূপ মিলিয়ে যে পরিমাণ মৃত্যু হয় তার চেয়েও বেশি প্রাণ কেড়ে নেয়।
ভুক্তভোগী ওই নারী হাসপাতালে কাজ করার কারণে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো বেশ ভালোভাবেই জানতেন। একদিন কাজ করার সময় উঠে দাঁড়াতেই বুকে ও পাঁজরে এক অদ্ভুত চাপ অনুভব করেন তিনি। পরদিনও একই ঘটনা ঘটে। কোনো ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট ছিল না, কেবল হাঁটার সময় এক ধরনের অস্বস্তিকর চাপ সৃষ্টি হতো। এক নার্স সহকর্মীর পরামর্শে তিনি জরুরি বিভাগে (ইআর) যান। সেখানে ইসিজি বা ট্রোপোনিন (হার্ট অ্যাটাক শনাক্তকারী প্রোটিন) পরীক্ষায় অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়েনি। ফলে তাঁকে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অস্বস্তি দূর না হওয়ায় পরদিন তিনি একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন। ক্যাথেটার পরীক্ষার পর জানা যায়, তাঁর দুটি ধমনিতে ব্লক রয়েছে, যার একটি ছিল সবচেয়ে বড় করোনারি ধমনিতে। এটি এমন এক ধরনের ব্লক যা অত্যন্ত মারাত্মক হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত বাইপাস সার্জারির পরিবর্তে রিং বা স্টেন্ট পরিয়ে তাঁর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
চিকিৎসকরা জানান, নারীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের লক্ষণগুলো ভিন্নভাবে প্রকাশ পাওয়া খুবই সাধারণ বিষয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত বুকে ব্যথা, বাঁ হাত, চোয়াল, ঘাড় বা পিঠে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বদহজম এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা যায়। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। বুকে বা বুকের নিচের অংশে চাপ, পেটের ওপরের অংশে অস্বস্তি, চোয়াল, ঘাড় ও পিঠের ওপরের অংশে ব্যথা, বমি বমি ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বদহজম বা অতিরিক্ত ক্লান্তি হতে পারে। অনেক সময় নারীদের বুকে কোনো ব্যথাই থাকে না।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, এই লক্ষণগুলো হঠাৎ করে তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ভাদালি জানান, অনেক নারী তাদের শারীরিক পরিবর্তনকে সাধারণ উদ্বেগ বা ফিটনেসের অভাব মনে করে অবহেলা করেন। তিনি নারীদের শরীরের যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। এছাড়া গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, মেনোপজ বা ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া, হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সিডারস-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আমেরিকো সিমোনিনি বলেন, নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকিকে প্রায়ই অবমূল্যায়ন করা হয়। পুরুষদের মতো নারীদের ক্ষেত্রেও রক্তে প্রোটিন ও প্রদাহের মাত্রা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন: উচ্চ-সংবেদনশীল সি-রিয়্যাক্টিভ প্রোটিন (hs-CRP) স্কোর, বংশগত ক্ষতিকর কোলেস্টেরল পরীক্ষার জন্য লিপোপ্রোটিন(এ), ধমনিতে প্লাক তৈরিকারী উপাদান পরিমাপের জন্য অ্যাপোলিপোপ্রোটিন বি এবং ধমনিতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ নির্ধারণে করোনারি আর্টারি ক্যালসিয়াম (সিএসি) স্কোর।
ড. সিমোনিনি আরও জানান, মেনোপজের আগে নারীদের শরীর বেশি ইস্ট্রোজেন তৈরি করে যা হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে মেনোপজের আগে নারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ—এই ধারণাটি ভুল। শিকাগোর ফোকাস কার্ডিওলজির ড. সোনাল চন্দ্র বলেন, পুরুষদের সমমানের লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও নারীদের ইমেজিং বা অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। ঐতিহাসিকভাবে চিকিৎসা গবেষণায় নারীদের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০১১ সালে শুরু হওয়া 'মিলিয়ন ভেটেরান প্রোগ্রাম' (এমভিপি) নামক একটি বড় গবেষণায় মূলত শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের ডেটা ব্যবহার করা হয়েছিল। ২০১০-এর দশকের কার্ডিওভাসকুলার ক্লিনিকাল ট্রায়ালগুলোতেও ৮৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ছিলেন পুরুষ। ড. চন্দ্রের মতে, নারীরা কর্মজীবী ও পরিবারের যত্নশীল হওয়ায় কর্মঘণ্টার মধ্যে গবেষণায় অংশ নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়। তবে গত ১০ বছরে লিঙ্গভিত্তিক হৃদরোগ সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা নারীদের নিজেদের স্বাস্থ্যের পক্ষে কথা বলার, চিকিৎসকদের কাছে বিস্তারিত পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরার এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয় মতামত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।






























