বর্তমান সময়ে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে বুফে পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণের প্রচলন ব্যাপক। এই ব্যবস্থায় হোটেল কর্তৃপক্ষ বড় বড় পাত্রে বিভিন্ন ধরনের খাবার সাজিয়ে রাখে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে গ্রাহককে যত খুশি খাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে এই পদ্ধতিতে খাবার বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থাকে না। যেহেতু বুফেতে বিক্রীত খাবারের পরিমাণ ও ধরন সুনির্দিষ্ট থাকে না, তাই ইসলামের মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে যে, এটি ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি হিসেবে বৈধ কি না। কারণ, ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বিক্রীত বস্তু ও তার পরিমাণ জানা থাকা চুক্তি শুদ্ধ হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত।
প্রখ্যাত মুফতি তাকি উসমানি তার 'ফিকহুল বুয়ু' (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮৮) গ্রন্থে লিখেছেন, ইসলামি বিধান অনুযায়ী এ ধরনের বিক্রয়চুক্তি বৈধ হওয়ার কথা নয়। কারণ, চুক্তির সময় বিক্রীত খাবার এবং তার পরিমাণ অজানা থাকে। ফলে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাসুল (সা.) এ ধরনের অনিশ্চয়তা বা প্রতারণাযুক্ত ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫১৩)। এর কারণও স্পষ্ট; কোনো গ্রাহকের ক্ষুধা বেশি হলে তিনি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলতে পারেন, আবার কেউ কম খেলে বিক্রেতার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
তবে বর্তমান যুগে বুফে পদ্ধতি একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত ব্যবসায় রীতিতে পরিণত হয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ ও গ্রাহক উভয় পক্ষই এ ব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত থেকে স্বেচ্ছায় চুক্তিতে অংশগ্রহণ করে। তারা সম্ভাব্য লাভ-লোকসানকে পূর্ব থেকেই মেনে নেয় এবং এটিকে বিরোধ বা প্রতারণার কারণ মনে করে না। বাস্তবেও এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সাধারণত কোনো ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি হয় না। তাই এখানে যে সামান্য গারার বা ধোঁকা রয়েছে, তা ফিকহের পরিভাষায় 'গারারে ইয়াসির' বা অতি সামান্য ও মার্জনাযোগ্য ধোঁকা হিসেবে গণ্য হবে, যা চুক্তিকে বাতিল করে না। এ কারণেই সমকালীন বহু ইসলামি ফকিহ বুফে পদ্ধতিকে বৈধ বলেছেন এবং এর ভিত্তিতে খাবার গ্রহণও বৈধ বলে মত দিয়েছেন।
এই মাসআলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরেকটি উদাহরণ হলো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গোসলখানা ব্যবহার করা। সেখানেও ব্যবহারকারী কতক্ষণ অবস্থান করবে বা কী পরিমাণ পানি ব্যবহার করবে তা নির্দিষ্ট থাকে না, তবুও ফিকহবিদরা সর্বসম্মতিক্রমে একে বৈধ বলেছেন। কারণ, এখানে বিদ্যমান অনিশ্চয়তা সামান্য এবং সমাজে স্বীকৃত, যা বিবাদের কারণ হয় না। ঠিক একই যুক্তিতে বুফে সিস্টেমের লেনদেনকেও বৈধ গণ্য করা হবে।
বুফে খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা উচিত। প্রথমত, নিজের রুচি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে খাবার গ্রহণ করা, কারণ অতিভোজন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দ্বিতীয়ত, কোনো অবস্থাতেই খাবার যেন নষ্ট বা অপচয় না হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরা খাও, পান করো; কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।' (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)।
বুফের ক্ষেত্রে শুরুতেই খাবারের পূর্ণ মালিকানা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করা হয় না, বরং তাকে নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে খাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি যে পরিমাণ খাবার গ্রহণ করে ভক্ষণ করেন, সে পরিমাণের ওপরই তার মালিকানা কার্যকর হয়। কেউ যদি বড় পাত্র থেকে খাবার তুলে নেন কিন্তু তা না খান, তাহলে এর বিধান স্থানীয় প্রচলিত রীতিনীতির ওপর নির্ভর করবে। যদি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী থালায় নেওয়া খাবার আর মূল পাত্রে ফেরত দেওয়া না হয় এবং তা গ্রাহকের জন্যই নির্ধারিত হয়ে যায়, তাহলে সেটি তার মালিকানায় গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যদি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তা ফেরত দেওয়া হয় এবং গ্রাহকের মালিকানা হিসেবে ধর্তব্য না হয়, তবে সেটি তার মালিকানা হিসেবে বিবেচিত হবে না।




























