চট্টগ্রামে সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রোগ নির্ণয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার খরচে বড় ধরনের মূল্য বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। একই ধরনের পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে করা সম্ভব হলেও বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় রোগীদের দুই থেকে ১২ গুণ পর্যন্ত বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্বল তদারকি, রেফারেল বাণিজ্য, অস্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ এবং দৃশ্যমান মূল্যতালিকার অভাবের কারণে সাধারণ রোগীরা নিয়মিত এই অতিরিক্ত ব্যয়ের শিকার হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প খরচে সেবা পাওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা এবং চিকিৎসক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের যোগসাজশ রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধ্য করে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নামে অতিরিক্ত বিল আদায় ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ রয়েছে। চমেক হাসপাতালের ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ রোগীর এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। তবে চাহিদার তুলনায় সেবা সীমিত হওয়ায় অনেক রোগী অপেক্ষা এড়াতে বাধ্য হয়ে বেসরকারি সেন্টারে যান।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালে যে সিবিসি পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা, বেসরকারি সেন্টারে তা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষায় চমেকে ৫০ টাকা লাগলেও বাইরে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া লিপিড প্রোফাইলে চমেকে ৩০০ টাকার বিপরীতে বাইরে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং ট্রপোনিন-আই পরীক্ষায় চমেকে ২০০-২৫০ টাকার বিপরীতে শেভরন ও এপিকসহ বিভিন্ন ল্যাবে প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ইউরিন আর/ই ও স্টুল আর/ই পরীক্ষা চমেকে ২০ টাকায় করা গেলেও বাইরে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। বিআরটিএ অনুমোদিত ডোপ টেস্ট চমেকে ৯০০ টাকায় করা গেলেও বেসরকারি হাসপাতালে তিন থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
বিশেষায়িত পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য প্রকট। চমেক হাসপাতালে কোলনস্কোপি পরীক্ষার খরচ প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা, যা বেসরকারি হাসপাতালে পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা। বোন ম্যারো পরীক্ষায় চমেকে প্রায় এক হাজার টাকা লাগলেও বেসরকারি খাতে তা প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। থাইরয়েড পরীক্ষার ক্ষেত্রে টিএসএইচ পরীক্ষায় চমেকে ৫০০ টাকা লাগলেও বেসরকারি ল্যাবে ৭০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং টি-৩, টি-৪ ও টিএসএইচ সমন্বিত থাইরয়েড প্রোফাইলে চমেকে ১৩০০-১৪০০ টাকার বিপরীতে বাইরে দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক্যাল ল্যাব ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. একেএম ফজলুল হক জানান, উন্নত যন্ত্রপাতি, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মুনাফাসহ পরিচালনা ব্যয়ের কারণেই সরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার মূল্য কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, মহানগরে ১৭৫টি নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ৯২টি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া জেলায় আরও ২১৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ৭৮টি হাসপাতাল নিবন্ধিত আছে। তিনি জানান, অনিয়ম বা অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বী জানান, সরকার পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করে দিচ্ছে এবং নিয়মিত তদারকির জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের একটি কমিটি কাজ করছে।
প্রকাশ : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১: ১৪আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৬, ১১: ১৮






























