সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসায়িক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইএসজি (ESG)—যা মূলত পরিবেশ (Environmental), সমাজ (Social) এবং সুশাসন (Governance)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। কোনো প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে, কর্মী ও সমাজের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা কেমন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পদ্ধতি কেমন—তা এই ইএসজি কাঠামোর মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে সাধারণ মানুষ বা বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ প্রায়শই ইএসজির পরিবেশগত ও সামাজিক দিকগুলোর দিকেই বেশি থাকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি, কর্মীদের কল্যাণ বা সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মতো বিষয়গুলো দৃশ্যমান হওয়ায় এগুলো নিয়ে আলোচনা বেশি হয়।
এর বিপরীতে, ইএসজির তৃতীয় স্তম্ভ ‘সুশাসন’ বা গভর্নেন্স নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য শোনা যায় না। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বা নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন হয় না। বোর্ড পর্যায়ে তদারকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কিংবা স্বচ্ছ রিপোর্টিংয়ের মতো বিষয়গুলো শিরোনামে না এলেও, যেকোনো টেকসই প্রতিশ্রুতির পেছনে একটি শক্তিশালী শাসন কাঠামোই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এটি নিশ্চিত করে যে, প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কথার কথা নয়, বরং বাস্তবসম্মত।
একটি সফল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে দূরদর্শী ব্যক্তিরা থাকলেও, সব সিদ্ধান্ত বা ঝুঁকি একা দেখা সম্ভব নয়। ব্যবসা যখন বড় হয়, তখন দায়িত্ব বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এ পর্যায়ে সুশাসন এমন একটি কাঠামো প্রদান করে, যা সবাইকে একই লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করে এবং স্বচ্ছতা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে সাহায্য করে। ইএসজির ক্ষেত্রে সুশাসনকে তাই ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বড় বড় জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু সেই কৌশল কে অনুমোদন দিচ্ছে, অগ্রগতির হিসাব কে রাখছে, তথ্যের নির্ভুলতা কে নিশ্চিত করছে এবং লক্ষ্য অর্জিত না হলে দায়বদ্ধতা কার—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর সুশাসনের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।
সুশাসনের অভাব তখনই সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়, যখন কোনো বড় ধরনের নৈতিক বিপর্যয় ঘটে। দুর্বল তদারকি ব্যবস্থার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল, নিয়ম লঙ্ঘন বা অকার্যকর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে, শক্তিশালী সুশাসন প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, ঝুঁকি মোকাবিলা করে এবং কর্মী, গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আস্থা অর্জনে সহায়তা করে।
গালাদারি ব্রাদার্স (Galadari Brothers)-এর ক্ষেত্রে সুশাসন তাদের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। বোর্ড পর্যায়ের তদারকি, এন্টারপ্রাইজ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা এবং গোপন হুইসেলব্লোয়ার মেকানিজমের মাধ্যমে কোম্পানিটি তাদের দায়বদ্ধতা ও সততা নিশ্চিত করে। পরিবর্তিত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা প্রাইভেসি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণের মতো উদীয়মান ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা নিয়মিত তাদের শাসন কাঠামোকে শক্তিশালী করছে।
পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ ও সামাজিক উদ্যোগগুলো ইএসজির দৃশ্যমান অংশ হলেও, সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন। এটি হয়তো সবসময় আলোচনার শিরোনামে থাকে না, কিন্তু এটিই সেই দায়বদ্ধতা তৈরি করে যা প্রতিশ্রুতিকে পরিমাপযোগ্য অগ্রগতিতে রূপান্তর করে এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক মূল্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
সূত্র: খালিজ টাইমস






























