আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখে ইরান যুদ্ধ নিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও তেহরানের অনমনীয় মনোভাব ট্রাম্পের নির্বাচনী স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করতে চলেছে। বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে কার্টারের সংকটের ঐতিহাসিক মিল খুঁজে পাচ্ছেন, যা শুরু হয়েছিল যখন বিপ্লবীরা ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন কূটনীতিক ও সামরিক কর্মীকে জিম্মি করেছিল। অবশেষে ৪৪৪ দিন বন্দিদশার পর ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি রেগান প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক মিনিট পর তারা মুক্তি পান।
১৯৮০ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার রিপাবলিকান প্রার্থী রোনাল্ড রেগানের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তেহরানে জিম্মি মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধারে চালানো একটি ব্যর্থ সামরিক অভিযান, যাতে আটজন মার্কিন সেনা নিহত হন। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার সেন্টার ফর পলিটিক্সের পরিচালক ল্যারি সাবাতো জানান, পরবর্তী সময়ে কার্টার স্বীকার করেছিলেন, অভিযানে আরও বেশি হেলিকপ্টার না পাঠানোই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর, ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে এক জটিল সামরিক সংঘাতের ফাঁদে পড়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ পথ নেই।
ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে প্রায় ছয় মাস আগে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় থাকা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি এ সপ্তাহে কোনো আনুষ্ঠানিক সমাধান ছাড়াই ভেস্তে গেছে। এর ফলে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের হাতে চলে গেছে। এই অবরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ছুঁয়েছে, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
জনমত জরিপগুলো বলছেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অধিকাংশ মার্কিন ভোটার নিজেদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। যুদ্ধের পক্ষে সমর্থনও তলানিতে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প কখনো হুমকি, কখনো অস্বীকার আবার কখনো হালকা বোঝানোর চেষ্টা করছেন। গত ১৪ আগস্ট নিউ ইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, একটি "দুষ্ট দেশকে" পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম (৪ ডলার) মেনে নেওয়া উচিত। এছাড়া ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওমানকে বোমা মারার হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালীকে "নতুন মার্কিন ভূখণ্ড" বলে দাবি করে ইরানের উপহাসের পাত্র হয়েছেন তিনি।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ভ্যালি নাসর জানান, ইরান ট্রাম্পকে সহজে পার পেতে দেবে না। তারা ট্রাম্পকে যুদ্ধের অবসান বা একতরফা বিজয় ঘোষণার সুযোগ না দিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁকে চরম মূল্য চোকাতে বাধ্য করতে চায়। তেহরান ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ফিরে আসার জন্য চার সপ্তাহের সময় দিয়েছে; অন্যথায় মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক সম্পদে হামলা জোরদার করার হুমকি দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইরান তাদের বাসিজ মিলিশিয়ার প্রধান হিসেবে কট্টরপন্থী আলেম হোসেইন তায়েবকে নিয়োগ দিয়েছে, যাতে দেশের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি তৎপরতা ও যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ দমন করা যায়।
মিসৌরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মেহরজাদ বোরুজেরদি বলেন, ইরান খুব একটা তাড়াহুড়ো করছে না, কারণ তারা নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে খুব একটা নাজুক মনে করছে না। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আয়ারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেলের দাম হুহু করে বাড়ছে—এক বছর আগের ৩.৭০ ডলার, এক মাস আগে ৫.০৬ ডলার এবং এক সপ্তাহ আগের ৫.৩০ ডলার থেকে বেড়ে এখন প্রতি গ্যালন ৫.৪৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের সামনে এখন সবচেয়ে কম ক্ষতিকর পথ হলো হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণেই পুনরায় খুলে দেওয়া, যা কার্যত পরাজয় মেনে নেওয়ার শামিল। তবে তেহরান ট্রাম্পকে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য নির্বাচনী বিপর্যয় নিয়ে ট্রাম্প নিজে কতটা চিন্তিত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবে তিনি ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। হোয়াইট হাউসের নতুন আইনি উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ডানপন্থী আইনজীবী উইল শার্ফকে নিয়োগ দিয়েছেন, যাতে সম্ভাব্য তদন্ত ও সমন মোকাবেলা করা যায়। পাশাপাশি ২০২০ সালের মতো এবারও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে আগাম প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ইরানের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বিজয় হবে, যা ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সমীকরণকেও প্রভাবিত করবে।



























