গত সপ্তাহে স্বাস্থ্যখাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে, যা ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটলেও এদের মধ্যে গভীর সংযোগ রয়েছে। সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমিরেটস ড্রাগ এস্টাবলিশমেন্ট নন-সেগমেন্টাল ভিটিলিগোর চিকিৎসায় একটি দৈনিক সেবনযোগ্য ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, কারণ বিশ্বের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা এর আগে এই চর্মরোগের জন্য কোনো ওরাল বা মুখে খাওয়ার ওষুধের অনুমোদন দেয়নি। এই রোগটি ত্বকের রঞ্জক পদার্থ হারিয়ে ফেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং বিশ্বজুড়ে প্রতি একশ জনের মধ্যে একজন এতে আক্রান্ত হন।
ইমিউন সিস্টেমের দ্বিমুখী ভূমিকা
ভিটিলিগো এবং ক্যানসারের এই নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। ভিটিলিগোর ক্ষেত্রে শরীর ভুলবশত নিজেরই রঞ্জক উৎপাদনকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে। এতদিন এর চিকিৎসা মূলত ক্রিম, আলোক থেরাপি বা প্রসাধনী ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নতুন অনুমোদিত ওষুধটি শরীরের সেই ভুল সংকেত পাঠানো প্রক্রিয়াকে বাধা দেয়, যা এতদিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
অন্যদিকে, ক্যানসারের ক্ষেত্রে সমস্যাটি বিপরীত। টিউমার কোষগুলো শরীরের নিজস্ব কোষ হওয়ার কারণে ইমিউন সিস্টেম সেগুলোকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয় এবং আক্রমণ করে না। মার্ক এবং মডার্না তাদের পরীক্ষামূলক ক্যানসার টিকার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান খুঁজছে। তারা টিউমার থেকে সংগৃহীত জেনেটিক ত্রুটির একটি ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’ বা পরিচয়পত্র তৈরি করে তা টিকার মাধ্যমে রোগীর শরীরে প্রবেশ করায়, যা ইমিউন সিস্টেমকে নির্দেশ দেয় নির্দিষ্ট সেই কোষগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে।
ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
- ১১০০ জনেরও বেশি রোগীর ওপর চালানো ট্রায়ালে দেখা গেছে, এই টিকা এবং বিদ্যমান ক্যানসার ওষুধের সমন্বয়ে মেলানোমা রোগীদের ক্যানসার ফিরে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- প্রথাগত ওষুধগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট রোগের জন্য তৈরি করা হয়, কিন্তু এই টিকাটি প্রতিটি রোগীর টিউমারের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ব্যাচ সাইজ ওয়ান’ ধারণার জন্ম দিয়েছে।
- গবেষকরা এখন ‘ইনভার্স ভ্যাকসিন’ বা বিপরীত টিকার ওপর কাজ করছেন, যার লক্ষ্য হলো পুরো রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল না করে নির্দিষ্ট কোনো টার্গেটের প্রতি শরীরের সহনশীলতা তৈরি করা।
- এ ধরনের গবেষণার মাধ্যমে টাইপ ১ ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস এবং সিলিয়াক ডিজিজের মতো অটোইমিউন রোগের স্থায়ী সমাধানের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।
যদিও এই টিকাগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল এবং দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিয়ে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, তবে এটি স্পষ্ট যে চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন কেবল রোগ শনাক্তকরণের ওপর সীমাবদ্ধ নেই। বরং রোগীর নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রশিক্ষিত করে রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করা যায়, সেই নতুন দিগন্তের দিকেই বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ফুসফুস, কিডনি এবং মূত্রাশয়ের ক্যানসারের ওপরও এই টিকার ট্রায়াল চলছে।
এই নতুন ওষুধগুলো বর্তমানের অটোইমিউন চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা দূর করতে সক্ষম। বর্তমানের ওষুধগুলো ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফলে রোগী সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিগুলো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে কাজ করার ফলে শরীরের সামগ্রিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকবে। যদিও এই চিকিৎসাগুলো রাতারাতি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসবে না, তবে এই উদ্ভাবনগুলো প্রমাণ করে যে চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। দুবাই ভিত্তিক স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক সাইরাস রোয়েডারের মতে, এই অগ্রগতিগুলো আমাদের শরীরের নিজস্ব সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
সূত্র: গালফ নিউজ






























