চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতায় এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর তীরে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে আগামী রোববার, ৩০ আগস্ট। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে নির্মিত এই প্রকল্পটি দেশের বন্দর অবকাঠামোয় এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনার জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৭০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে। এর চেয়ে বড় জাহাজগুলো সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো আঞ্চলিক বন্দরে পণ্য খালাস করতে বাধ্য হয়, যা বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বাড়তি সময় ও ব্যয় যোগ করে। এপিএম টার্মিনালসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান এই প্রক্রিয়ায় পণ্য পরিবহনে ৭ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় নষ্ট হতে পারে। লালদিয়া টার্মিনাল চালু হলে এই বাড়তি ধাপগুলো আর প্রয়োজন হবে না, যা বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ সময়নির্ভর রপ্তানি খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, এই টার্মিনালটি চালু হলে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমবে এবং পণ্য পরিবহনের খরচ ও সময় সাশ্রয় হবে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এই উদ্যোগকে দেশের লজিস্টিক খাতের জন্য একটি শুভ সূচনা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, ২০১২ সাল থেকে গত ১৪ বছর ধরে এই টার্মিনাল নির্মাণের স্বপ্ন দেখছিলেন ব্যবসায়ীরা।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দীর্ঘ পথচলা বেশ ঘটনাবহুল। ২০১৩ সালে এর নীতিগত অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসনিক ও বাস্তব জটিলতায় তা থমকে ছিল। পরবর্তীতে লালদিয়া চরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জমি বন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আসার পর প্রকল্পটি গতি পায়। ২০২১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ২০২৩ সালের ২১ মে ডেনমার্কের মারস্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে।
২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়। ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ-ডেনমার্ক প্রথম পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভায় এপিএম টার্মিনালসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সবশেষে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এপিএমটি বিভিকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং একই দিনে কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ৩৩ বছরের মেয়াদে প্রথম তিন বছর নির্মাণকাজ এবং পরবর্তী ৩০ বছর টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে এপিএম টার্মিনালস।
টার্মিনালটি প্রায় ৪৯ দশমিক ১৫ একর জমির ওপর নির্মিত হবে, যার মধ্যে ৩২ একর মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একর কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর ট্রাক পার্কিং ও অন্যান্য সুবিধার জন্য বরাদ্দ থাকবে। নকশা অনুযায়ী, ৬১৬ মিটার দীর্ঘ জেটিতে সর্বোচ্চ ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হবে এই টার্মিনাল থেকে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি হবে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব টার্মিনাল। কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য সাতটি জাহাজ-টু-শোর ক্রেন এবং ৩২টি বিদ্যুৎচালিত রাবার-চাকা ক্রেন ব্যবহার করা হবে। ইয়ার্ডের ক্রেনগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা কর্মীদের ঝুঁকি কমাবে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি বন্দরে অবস্থানরত জাহাজকে সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের উপযোগী অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম জানান, সরকারি কোনো বড় মূলধনী বিনিয়োগ ছাড়াই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন আধুনিক অবকাঠামো পাওয়া দেশের জন্য বড় সাফল্য। তবে যথাসময়ে নির্মাণকাজ শেষ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নির্মাণপর্বে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি টার্মিনাল চালু হলে স্থায়ীভাবে কয়েকশ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও জাহাজসেবা খাতে পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে ব্যবসায়ীদের মতে, শুধু টার্মিনাল নির্মাণই যথেষ্ট নয়। এর সুফল পুরোপুরি পেতে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা বজায় রাখা এবং টার্মিনালের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। একইসঙ্গে কাস্টমস ও পণ্য খালাস প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো না গেলে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থায় জট তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলোর সরাসরি সেবা নিশ্চিত করাও এই প্রকল্পের সফলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। লালদিয়া টার্মিনাল সেই চাপ মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সমুদ্রবাণিজ্যে কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, বরং দেশের রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা যুক্ত হবে বন্দরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর চেয়ে বড় জাহাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পণ্য ছোট জাহাজে করে সিঙ্গাপুর, কলম্বোসহ আঞ্চলিক বন্দরে নিয়ে গিয়ে সেখানে বড় জাহাজে তুলে দিতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর চুক্তিতে নির্ধারিত পূর্বশর্তগুলো পূরণ করে ২২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এপিএম টার্মিনালসের কাছে প্রকল্পের সাইট হস্তান্তর করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পিপিপির আওতায় বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্পে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জমি ও বন্দরের মালিকানা ধরে রাখবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে লালদিয়া চরে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার ভাটিতে গুপ্তা বাঁকের পরবর্তী এলাকায় টার্মিনালটি নির্মাণ করা হবে।



























