গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজারের সরু গলিতে শত বছর ধরে টিকে আছে তুন্দুল রুটির ঐতিহ্য। স্থানীয়দের কাছে এই গলিটি ‘রুটি মহল’ নামে পরিচিত। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই বাজারে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৩টি রুটির দোকান রয়েছে। তবে বুধবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে এই গলির চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সকাল থেকেই দূর-দূরান্তের ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
বরমীর তুন্দুল রুটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর বিক্রির পদ্ধতি। দেশের অন্য সব স্থানের মতো এখানে পিস হিসেবে রুটি বিক্রি হয় না, বরং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী দাঁড়িপাল্লায় মেপে রুটি দেওয়া হয়। এক কেজি, আধা কেজি বা তার চেয়ে কম-বেশি—ক্রেতারা যতটুকু চান, দোকানিরা ততটুকুই মেপে ব্যাগে তুলে দেন। পরিবারের জন্য বেশি রুটি কিনতে আসা ক্রেতাদের কাছে এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত সুবিধাজনক ও জনপ্রিয়।
রুটি মহলের অন্যতম ব্যস্ত ব্যবসায়ী কফিল উদ্দিন। তাঁর টিনের ছোট দোকানে বুধবার সকাল থেকেই ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। দোকানের সামনে বড় টেবিলে সাজানো থাকে গরম তুন্দুল রুটি ও জিলাপি। দোকানের ভেতরে থাকা বেঞ্চগুলোতে বসে অনেক ক্রেতা ডাল ও শুকনা মরিচের ভর্তা দিয়ে গরম রুটি উপভোগ করেন। জায়গা খালি না থাকায় অনেককে আবার দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কফিল জানান, প্রতি বুধবার হাটের দিনে তাঁর দোকানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার রুটি বিক্রি হয়। চাহিদার কথা মাথায় রেখে এখন সপ্তাহের প্রতিদিনই রুটি তৈরি ও বিক্রি করছেন তিনি।
রুটি তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ আকর্ষণীয়। দোকানের এক পাশে থাকা বিশাল ও গভীর চুলার সামনে কারিগররা আটার মণ্ড তৈরি করেন। হাতের আঙুলের বিশেষ কৌশলে মণ্ডটিকে পাতলা ও বড় করে কাপড়ের তৈরি চেপ্টা পাত্রে রেখে চুলার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মুহূর্তেই রুটি ফুলে উঠলে ছোট লোহার দণ্ড দিয়ে তা বের করে টেবিলে আনা হয়। কফিলের দোকানে প্রতি কেজি তুন্দুল রুটির দাম ১২০ টাকা। এছাড়া দোকানে বসে খেলে বড় রুটি ২০ টাকা এবং ছোট রুটি ১০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
স্থানীয় ক্রেতা মো. সুরুজ মিয়া জানান, বরমী বাজারে গরু কিনতে এসে তিনি নিয়মিত রুটি মহলে নাশতা করেন। কাওরাইদ থেকে আসা মো. আসাদুজ্জামান জানান, বরমীর তুন্দুল রুটি শুধু খাবার নয়, এটি বাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। রুটি কিনতে আসা হিরন মিয়া বলেন, হাটে এলে রুটি খাওয়া ও পরিবারের জন্য নিয়ে যাওয়া অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
দোকানি কফিল উদ্দিন বলেন, দাদা ও বাবার হাত ধরে এই ব্যবসায় তিনি এসেছেন। এটি কেবল একটি পেশা নয়, বরং তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। তবে উপকরণের দাম বৃদ্ধিতে বড় সাইজের রুটি তৈরি করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তবুও স্বাদ ও ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। কফিলের ছেলে সাগর জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে এই কাজে যুক্ত আছেন এবং এই পরিচয় ভবিষ্যতে ধরে রাখতে চান। হাটের কোলাহলে যখন দাঁড়িপাল্লায় রুটি ওজন করা হয়, তখন তা কেবল পণ্য কেনাবেচা নয়, বরং শত বছরের বরমী বাজারের ঐতিহ্যের এক টুকরো অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়।



























