চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) বিমানবাহিনী তাদের বড় ধরনের সামরিক হামলা ও অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির একটি তথ্যচিত্রে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। পিএলএ-এর ৯৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগস্টের শুরুতে প্রচারিত ওই তথ্যচিত্রে জানানো হয়, এই এআই সিস্টেমটি শত শত লক্ষ্যবস্তুর মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে, কয়েক ডজন ফরমেশন সমন্বয় করতে পারে এবং ১০০টিরও বেশি কৌশলগত ইউনিটকে কাজ বরাদ্দ দিতে পারে। ইতিমধ্যে একাধিক অভিযানে সিস্টেমটি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রযুক্তির ব্যবহার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জুলাইয়ের শেষের দিকে তিনি পিএলএ-কে চালকবিহীন বুদ্ধিমান প্রযুক্তির সামরিক প্রয়োগ জোরদার করতে এবং পর্যায়ক্রমে একটি আধুনিক বুদ্ধিমান সামরিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। চীন দীর্ঘদিন ধরেই এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে, তবে ২০২৭ সালের মধ্যে সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা বেইজিং নির্ধারণ করেছে—যা পিএলএ-এর শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী—তা অর্জনে এখন বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুতগতির যুদ্ধবিমান এবং লক্ষ্যবস্তুগুলোর গতিবিধি এত দ্রুত পরিবর্তিত হয় যে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে মানুষের পক্ষে এত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই এআই সিস্টেমটি মূলত কমান্ড চেইনের উচ্চতর স্তরে কাজ করে এবং এটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন বা হামলা চালায় না। বরং এটি commander-দের বিমান, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সহায়ক সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তার সুপারিশ করে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের হাতেই থাকে।
তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার চীনের কূটনৈতিক অবস্থান এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে একটি বৈপরীত্য তৈরি করেছে। চীন আন্তর্জাতিক ফোরামে সবসময় দাবি করে আসছে যে এআই মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে, যে পরিকল্পনা তৈরি করতে মানুষের কয়েক ঘণ্টা সময় লাগত, তা এই সিস্টেম মাত্র কয়েক মিনিটে সম্পন্ন করে। ফলে কমান্ডারদের ভূমিকা কেবল নামমাত্র সায় বা 'রাবার স্ট্যাম্পে' পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দ্রুতগতির অভিযানের সময়, যেমন তাইওয়ান প্রণালীতে বিমান হামলার মতো পরিস্থিতিতে, এআই-এর তৈরি করা পরিকল্পনা গভীরভাবে যাচাই করার সময় মানুষের থাকবে না। এর ফলে 'অটোমেশন বায়াস' বা যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ঝুঁকি বাড়ে। যদি কোনো ভুল বা বেআইনি হামলার ঘটনা ঘটে, তবে তার দায় কার ওপর বর্তাবে—যিনি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন তার ওপর, নাকি যিনি সিস্টেমটি তৈরি করেছেন তার ওপর? ইসরায়েলের গাজা হামলার উদাহরণ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের ফলে গভীরভাবে যাচাই করার সময় পাওয়া যায় না।
এই প্রযুক্তির প্রভাব ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পড়বে। দক্ষিণ চীন সাগরে কোনো সংকট তৈরি হলে চীন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জটিল বিমান হামলা চালাতে সক্ষম হবে। এর ফলে প্রথাগত কূটনৈতিক যোগাযোগ বা হটলাইনের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের সুযোগ কমে যাবে, কারণ মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি এআই-এর চেয়ে ধীর হবে। ফলে অকুস (AUKUS) এবং কোয়াড (Quad)-এর মতো জোটগুলোকে এখন এই 'অ্যালগরিদমিক শক' বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আকস্মিক আঘাত মোকাবেলার কৌশল তৈরি করতে হবে。
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনায় চীনের সামগ্রিক এআই একীভূতকরণ কৌশলের অংশ। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে মানুষের ভূমিকা কেবল যন্ত্রের গতিকে অনুমোদন দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এআই-এর এই প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে মেশিন-চালিত যুদ্ধের এক নতুন যুগের সূচনা করছে, যেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার সময় বা সুযোগ হয়তো আর থাকবে না।

























