কঙ্গোতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে দ্রুত বিস্তারকারী ইবোলা প্রাদুর্ভাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার কয়েক মাস আগেই শুরু হয়েছিল বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রাদুর্ভাবটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হলেও মূলত গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এটি ছড়াতে শুরু করে। ফলে দেশটির পূর্বাঞ্চলে ভাইরাসটির সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
ডব্লিউএইচও-এর আফ্রিকার আঞ্চলিক পরিচালক ড. মোহামেদ ইয়াকুব জানাবি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্সিং বিশ্লেষণ করে এই প্রাদুর্ভাবের শুরুর সময়টি শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, শুরুর দিকে কঙ্গোর আক্রান্ত রোগীদের কিছু লক্ষণকে ভুলবশত ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। জানাবি বলেন, আমরা ভাইরাসের পেছনে ছুটছি, আর ভাইরাসটি আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
গত ১৫ মে ঘোষিত এই প্রাদুর্ভাবটি পূর্ববর্তী ইবোলা সংক্রমণের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এর জন্য দায়ী বিরল 'বুন্দিবুগিও' ভাইরাসের কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা নেই। শুরুর দিকে সাধারণ ইবোলা ভাইরাসের পরীক্ষা করার কারণে রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব হয়েছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই প্রাদুর্ভাবটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। বেতন না পাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীদের ধর্মঘট, সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর হুমকি, দীর্ঘদিনের ট্রমাগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষোভ এবং ইবোলা নিয়ে নানা অপপ্রচার পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। দুর্গম ও কাঁচা রাস্তায় স্বাস্থ্যকর্মীদের যাতায়াত করতে হচ্ছে এবং সুরক্ষাসামগ্রীর চরম ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষ হাত ধোয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য পানির সংকটে ভুগছেন।
ইতিহাসের যেকোনো ইবোলা প্রাদুর্ভাবের চেয়ে এই দফায় দ্রুততম সময়ে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এমনকি ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় হওয়া ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের চেয়েও এর গতি বেশি। সে সময় পশ্চিম আফ্রিকায় ২৮,০০০ আক্রান্তের মধ্যে ১১,০০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ১,০০০ মৃত্যুর মাইলফলকে পৌঁছাতে প্রায় আট মাস সময় লেগেছিল। ইবোলা অত্যন্ত সংক্রামক এবং এটি আক্রান্ত ব্যক্তির লালা, রক্ত, বমি বা বীর্যের মতো শারীরিক তরল এবং দূষিত বিছানা বা কাপড়ের সংস্পর্শে ছড়াতে পারে।
ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেউসুস সম্প্রতি কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানান, ইবোলা প্রতিরোধের প্রচেষ্টার চেয়ে ভাইরাসটি দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং কিছু হটস্পটে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন আক্রান্তদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই নজরদারির বাইরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্য থেকে শনাক্ত হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা ও রুয়ান্ডা সীমান্তের কাছাকাছি কঙ্গোর এই দুর্গম অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে চলা বিদ্রোহী সংঘাতের কারণে চিকিৎসা সেবা এমনিতেই বিপর্যস্ত। বর্তমানে ভাইরাসের ভয়ে অনেক গর্ভবতী নারী ও সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া এড়িয়ে চলছেন, যা তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে। অতীতেও ২০১৪-২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার প্রাদুর্ভাবসহ বেশ কয়েকটি ইবোলা সংক্রমণ বিলম্বে ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় ২০১৪ সালের মার্চে প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরবর্তীতে জানা যায় প্রথম সংক্রমণটি ঘটেছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে।






























