মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশটির জান্তাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার ও জাইরোকপ্টারের মতো কম খরচের সস্তা উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা বাড়াচ্ছে। জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল কর্তৃক ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’ (আইআইএমএম) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, তাদের সহযোগী মিলিশিয়া এবং বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিষয়ে বছরব্যাপী তদন্ত চালিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
আইআইএমএম জানিয়েছে, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে জান্তা-আয়োজিত নির্বাচনের সময় দেশজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পায়। নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে বিমান হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল এবং নির্বাচনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া নির্বিচারে আটক, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনাও নথিবদ্ধ করেছেন তদন্তকারীরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জান্তা বাহিনী বিমান হামলায় ‘ডাবল-ট্যাপ’ কৌশল ব্যবহার করায় বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ছে। এই পদ্ধতিতে প্রথম হামলার পর দ্রুত দ্বিতীয় আরেকটি হামলা চালানো হয়, যার মূল লক্ষ্য থাকে উদ্ধারকর্মী, আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসা মানুষ এবং পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তিরা।
আইআইএমএম-এর তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার সেনাবাহিনী কম উচ্চতা থেকে গাইডেড-বিহীন বিস্ফোরক দিয়ে হামলা চালাতে মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার (প্যারামোটর), জাইরোকপ্টার এবং ড্রোন ব্যবহার করছে। সাগাইং অঞ্চলের সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা গেছে, প্যারামোটরচালকরা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন, যাতে কোনো শব্দ ছাড়াই নিঃশব্দে ভেসে গিয়ে হামলা চালানো যায়। এর ফলে বেসামরিক নাগরিকরা পালিয়ে যাওয়া বা নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ বা সতর্কবার্তা পান না।
এদিকে, রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত অন্যতম শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) জানিয়েছে, চলতি মাসের ১ থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে তিনটি শহরে জান্তার বিমান হামলায় অন্তত ২০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি হামলায় একসঙ্গে আটটি উড়োজাহাজ অংশ নেয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালানো হয়।
সামরিক সরকার অবশ্য জাতিসংঘ বা আরাকান আর্মির এসব অভিযোগের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে অতীতে তারা দাবি করেছিল যে তারা কেবল বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানে এবং প্রতিরোধ বাহিনীকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে।
অন্যদিকে, আরাকান আর্মির বিরুদ্ধেও গুরুতর অপরাধের তদন্ত করছে আইআইএমএম। তাদের বিরুদ্ধে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিম নারীদের ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শিশু সেনা নিয়োগ এবং মসজিদ ধ্বংস করার অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জান্তার বিতর্কিত নির্বাচনী আইনের অধীনে বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনলাইনে নির্বাচনের সমালোচনা করা বা নির্বাচন-বিরোধী লিফলেট বিতরণ করার মতো অপরাধে এই আইনে ২০ বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সমালোচকেরা এই নির্বাচনকে একটি প্রহসন হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যা ২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণকে আরও পাকাপোক্ত করার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল।
অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স (এএপিপি) নামের একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এ পর্যন্ত ৮,০০০-এরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৩১,০০০-এরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন。
আইআইএমএম-এর প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, "আমরা যে প্রমাণগুলো সংগ্রহ করছি, তার প্রতিটির পেছনে এমন সব মানুষ রয়েছেন যাদের জীবন এই অপরাধগুলোর কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। মিয়ানমারজুড়ে মানুষ কেবল সহিংসতার সার্বক্ষণিক হুমকির মধ্যেই বাস করছে না, বরং তারা যা সহ্য করেছে তার গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের সাথেও লড়াই করছে।" সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা ১,৬০০-এরও বেশি উৎস ও প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে, যা ভবিষ্যতে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে ব্যবহার করা হবে।






























