হলিউডের ঐতিহ্যবাহী সনি পিকচার্সের কালভার সিটি স্টুডিওর ঠিক পাশেই এ গ্রীষ্মে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এক নতুন প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী। 'প্রমিজ' নামের এই নতুন স্টুডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে। যেখানে একসময় 'সিংগিন ইন দ্য রেইন' বা 'মেন ইন ব্ল্যাক'-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলোর শুটিং হয়েছিল, সেই স্টুডিওর বিশাল দেয়াল পেরিয়ে যাওয়ার আর প্রয়োজন বোধ করছেন না নতুন যুগের এই নির্মাতারা। অপেক্ষাকৃত সাধারণ কার্যালয় থেকেই তারা মার্কিন ও শীর্ষস্থানীয় চীনা এআই মডেল ব্যবহার করে ব্যাকগ্রাউন্ড, স্পেশাল ইফেক্ট এবং এমনকি 'সিন্থেটিক পারফর্মার' বা কৃত্রিম অভিনয়শিল্পী তৈরি করছেন।
গুগল, সিলিকন ভ্যালির ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট এবং ডিজনির আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা 'প্রমিজ' হলিউডের অন্যতম উদীয়মান এআই স্টুডিও। এর ফলে প্রথাগত স্টুডিওগুলোর বিশাল সাউন্ড স্টেজ বা বিপুল অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসছে। তবে এই প্রবণতা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। ক্রিস্টোফার নোলান এবং গুইলারমো দেল তোরোর মতো প্রথম সারির পরিচালকেরা এই জেনারেটিভ প্রযুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। অভিনেতা ও লেখকেরা নিজেদের চাকরি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। হলিউডের শিল্পী, লেখক ও পরিচালকদের প্রতিনিধিত্বকারী ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসওম্যান লরা ফ্রিডম্যান গত মাসে সতর্ক করে বলেছেন, "হাজার হাজার মার্কিন কর্মীর কর্মসংস্থান হারানোর আগ পর্যন্ত আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারি না।"
এই শঙ্কার মাঝেই প্রমিজের নতুন কার্যালয়ে এআই-এর সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা গেছে। এ সপ্তাহে স্টুডিওটির নতুন ঘোষিত হরর সিনেমা 'টাচ গ্রাস'-এর প্রাথমিক শুটিংয়ের জন্য সারি সারি কম্পিউটারের মাঝে ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন অভিনেত্রী টোরি থমাস। সিনেমাটির বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার। শুটিংয়ের সাউন্ড স্টেজটি ছিল অফিসের একটি কোণে ঝুলানো কিছু সাদা কাপড় মাত্র। একটি ছোট ক্যামেরা দিয়ে টোরি থমাসের দৌড়ানোর দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছিল এবং বাকি কাজ করছিল এআই। এআই প্রযুক্তি রিয়েল-টাইমে তার নড়াচড়াকে চলতি মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত চীনা এআই মডেল 'সিড্যান্স ২.৫'-এর তৈরি করা দুলতে থাকা ঘাসের মাঠের ব্যাকগ্রাউন্ডে বসিয়ে দিচ্ছিল, যা উৎপাদন সময় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিচালকের হাতের মনিটরে পুরো দৃশ্যটি—অভিনেত্রী ও ব্যাকগ্রাউন্ডসহ—তাত্ক্ষণিকভাবে এমনভাবে ভেসে উঠছিল যেন সত্যিই কোনো বাস্তব লোকেশনে শুটিং হচ্ছে। এমনকি এআই-নির্মিত সেই মাঠের ঘাসগুলোও নড়ে উঠছিল যখন থমাস তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্য একটি শটে সেই মাঠটিকে সহজেই একটি অন্ধকার পাতাল গুহায় রূপান্তর করা হয়। মনিটরে এক পলক তাকিয়েই থমাস দেখতে পাচ্ছিলেন তিনি কোন ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে অভিনয় করছেন।
এআই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রমিজ একা নয়। নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের ১,০০০টি শিরোনামের মধ্যে ৩০০টিতেই তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। 'দ্য দা ভিঞ্চি কোড' এবং 'এ বিউটিফুল মাইন্ড'-এর মতো সিনেমার প্রখ্যাত পরিচালক রন হাওয়ার্ড আরেকটি নতুন এআই স্টুডিও 'অবসিডিয়ান'-এর সাথে যৌথভাবে ভিয়েতনামের যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে একটি এআই-ভিত্তিক অ্যানিমেটেড ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্ম নির্মাণ করছেন। অভিনেতা ব্র্যাড পিটও এ সপ্তাহে এআই-এর পক্ষে কথা বলেছেন। তিনি জানান, যদিও এর বিরুদ্ধে অনেক বাধা রয়েছে, তবুও সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে এই এআই প্রযুক্তিই ৪০ থেকে ৯০ মিলিয়ন ডলারের মাঝারি বাজেটের সিনেমাগুলো নির্মাণে বড় সাহায্য করবে।
এই ধারণার সাথে সুর মিলিয়েছেন এআই যুগের নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা, ৩৭ বছর বয়সী কাভান "দ্য কিড" কার্ডোজা। তিনি 'ফ্যান্টম এক্স' নামের একটি স্টুডিও গড়ে তুলেছেন। তাঁর মতে, ৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে কোয়েন্টিন টারান্টিনো এবং স্পাইক লি-র হাত ধরে যে সৃজনশীল বিপ্লব ঘটেছিল, এআই-এর মাধ্যমে বড় স্টুডিওগুলোকে এড়িয়ে ঠিক তেমনই এক নতুন সৃজনশীল যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে।
প্রমিজের এই শুটিংয়ে যুক্ত ছিলেন অস্কারজয়ী জোয়েল হাইনেক, যিনি ১৯৮৭ সালে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের অ্যাকশন-হরর সিনেমা 'প্রেডিটর'-এর ম্যানুয়াল স্পেশাল ইফেক্টসের কাজ করেছিলেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, "আমরা যখন অপটিক্যাল থেকে ডিজিটাল ফিল্মে স্থানান্তরিত হয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল যেন স্বর্গে চলে এসেছি। এখন আবার ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে। অনেক কাজ এখন খুব সহজে করা যাচ্ছে। আমি এআই-কে স্বাগত জানাই। অনেকে হয়তো এটি নিয়ে শঙ্কিত বা কিছুটা ভীত, কিন্তু আমি এর মাঝে অবিশ্বাস্য সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।"
তবে ক্রিস্টোফার নোলানের মতো অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 'ওডিসি'র এই পরিচালক বলেন, "আমি এর আগে কোনো প্রযুক্তিকে এত দ্রুত অগ্রসর হতে দেখিনি, যা সাধারণ মানুষ এত সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। সবার মনে, বিশেষ করে তরুণদের মনে এটি নিয়ে চরম সন্দেহ রয়েছে।" প্রয়াত অভিনেতা ভাল কিলমারকে এআই-এর মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করে নতুন চলচ্চিত্রে অভিনয় করানো এবং 'টিলি নরউড' নামের এআই "অভিনেতা"র আত্মপ্রকাশ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অভিনেত্রী এমিলি ব্লান্ট একে "সত্যিই অত্যন্ত ভীতিকর" বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং অনুরোধ জানিয়েছেন, "দয়া করে আমাদের মানবিক সংযোগ কেড়ে নেওয়া বন্ধ করুন।"
কিন্তু নতুন এআই স্টুডিওগুলো এসব বাধায় দমে যেতে রাজি নয়। প্রমিজের 'টাচ গ্রাস' সিনেমার পরিচালক ডেভ ক্লার্ক—যিনি ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকের লস অ্যাঞ্জেলেসের হিপ-হপ সাউন্ডট্র্যাকের পটভূমিতে 'হার্ডকোর ৯৪' নামের একটি অ্যানিমেশন নিয়েও কাজ করছেন—বলেন, "চমৎকার সংলাপ এবং ব্যাকস্টোরি" থাকলে এআই-নির্মিত চরিত্রগুলোও আকর্ষণীয় এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন অভিনয়শিল্পীদের ইউনিয়ন 'স্যাগ-আফট্রা' (Sag-Aftra) অবশ্য এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করবে, তবে কার্ডোজা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, "আগামী বছর নাগাদ এআই অভিনেতারা বাস্তব অভিনেতাদের মতোই দক্ষ হয়ে উঠবে।"
প্রমিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী জর্জ স্ট্রমপোলোস অনুমান করছেন যে, হাইব্রিড এআই চলচ্চিত্র—যেখানে বাস্তব অভিনেতাদের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে—প্রথাগত চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে ২০% থেকে ৫০% সস্তা হবে। এটি নির্মাতাদের বড় স্টুডিওগুলোর বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেবে। তিনি বলেন, "আমরা স্বাধীন ও অত্যন্ত ক্ষমতাবান সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের এক সুবর্ণ যুগের শুরুতে রয়েছি—এদের আপনি ছোট বা মাইক্রো স্টুডিও বলতে পারেন—যা আরও বেশি সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার সাহস জোগাবে।"
চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে এআই-এর ব্যবহার নিয়ে প্রযোজক এবং এআই উপদেষ্টা জোয়ানা পপার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, "এটি গল্প বলার প্রতিভা এবং শৃঙ্খলা আছে এমন যে কাউকে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার ক্ষমতা দেয়।" তবে তার শঙ্কাও রয়েছে, "উদ্বেগের বিষয় হলো… যদি মাত্র পাঁচটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের সব আর্থিক সুবিধা লুটে নেয়।"
রন হাওয়ার্ড এবং ব্রায়ান গ্রেজারের ৪১ বছরের পুরোনো স্টুডিও 'ইমাজিন'-এর এখন একটি নিজস্ব এআই স্টুডিও রয়েছে, যার নাম 'অবসিডিয়ান'। এটি তাদের বেভারলি হিলস সদর দফতর থেকে কাজ পরিচালনা করছে। অবসিডিয়ানের সাথে অংশীদারিত্বে তারা 'দ্য কোড' নামে একটি এআই-ভিত্তিক অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম তৈরি করছে, যা ভিয়েতনামে বন্দি থাকা মার্কিন যুদ্ধবন্দিদের আঁকা ছবির ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হচ্ছে এবং এটি পরিচালনা করছেন রন হাওয়ার্ড নিজে।
অবসিডিয়ানের নির্বাহী প্রযোজক ডি রায়ান রিব অনুমান করছেন যে, এই প্রযুক্তি ৩০% থেকে ৪০% খরচ বাঁচাবে। তিনি জানান, প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী ডজনখানেক শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি বৈঠক করেছেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে সবাই এটি ব্যবহার করবে। তবে হলিউডে এআই-এর ব্যবহারকে তিনি প্লাস্টিক সার্জারির সাথে তুলনা করেছেন; সবাই এটি করছে কিন্তু কেউ তা নিয়ে কথা বলতে চায় না। রিব বলেন, "এটি শতভাগ প্লাস্টিক সার্জারির মতোই।"
তিনি আরও বলেন, "আমি এমন স্টুডিওগুলোর সাথে বৈঠক করেছি যেখানে বলা হয় একটি হরর সিনেমায় নির্দিষ্ট সংখ্যক 'জাম্প স্কেয়ার' থাকতে হবে… কিন্তু আমি কেন কেবল গল্পটি লিখতে পারব না? যদি সেখানে দুটি জাম্প স্কেয়ার থাকে, তবে দুটিই থাকবে। যদি ১০টি থাকে, তবে ১০টিই থাকবে। আমরা কেন আগে থেকে নির্ধারিত ছক মেলাতে যাব? ওটা সৃজনশীলতা নয়—ওটা হলো পণ্য উৎপাদন।" তিনি মনে করেন, এআই-চালিত চলচ্চিত্র নির্মাণের এই বিকাশ তাকে ৯০-এর দশকের কোয়েন্টিন টারান্টিনো বা রবার্ট রদ্রিগেজের যুগের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাদের সিনেমা দেখলেই তাদের নাম না দেখেই বোঝা যেত এটি কার কাজ। অথচ বর্তমানে সিনেমা হলের সব ছবি দেখতে একই রকম লাগে।
কার্ডোজা চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি করা মডেলগুলোকে উচ্চ রেটিং দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইমেজ ও ভিডিও জেনারেশনসহ সব ক্ষেত্রেই তারা সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন, চীনা মডেলগুলো এত শক্তিশালী হওয়ার কারণ হলো সেগুলোকে "পৃথিবীর সবকিছুর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে", যা মেধা সম্পত্তি বা আইপি সংক্রান্ত বিধি-নিষেধের কারণে মার্কিন মডেলগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তবে ওয়াশিংটন যখন চীনা ওপেন-সোর্স এআই মডেলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে, তখন কার্ডোজা এমন শক্তিশালী টুলের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছেন, যা তাকে সৃজনশীলভাবে বিকশিত হতে সাহায্য করেছে। তিনি রসিকতা করে বলেন, "প্রয়োজনে আমি চীনে চলে যাব। আমি সত্যিই রসিকতা করছি না।"






























