গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নয়াদিল্লির কৌশলগত মহলে গভীর উদ্বেগ ও সংশয় তৈরি করেছে। তথাকথিত এই "ইসলামিক ন্যাটো" গড়ে ওঠার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি জানান, ভারত সরকার দেশের "জাতীয় নিরাপত্তা" এবং "আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা"-র ওপর ভিত্তি করে "এর প্রভাব খতিয়ে দেখছে"। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ভারত যেকোনো মূল্যে "তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে"।
তবে ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশ এই চুক্তি নিয়ে আরও বেশি সোচ্চার ও উদ্বিগ্ন। যদিও অনেকে এই চুক্তিকে কেবলই লোকদেখানো বা প্রচারণামূলক হিসেবে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তবে কেউ কেউ একে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের একটি বড় কূটনৈতিক চাল হিসেবে দেখছেন। এই চুক্তির ফলে নয়াদিল্লির জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতি তার দীর্ঘদিনের নীতি পুনর্মূল্যায়ন করার সময় এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উপসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ৮৮ লাখ ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন। এছাড়া, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ভারতের বৃহত্তম আঞ্চলিক বাণিজ্য অংশীদার, যা ভারতের মোট বাণিজ্যের ১৫.৪ শতাংশ দখল করে আছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই ভারতের সঙ্গে জিসিসির একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
যদিও মক্কা চুক্তির বিস্তারিত ধারাগুলো এখনো পুরোপুরি জনসমক্ষে আসেনি, তবে এই চুক্তিটি মূলত তিনটি ভিন্ন শক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে একজন জিসিসি সদস্য, একজন ন্যাটো সদস্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম দেশ। গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স (জিএফআই) ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, এই তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক শক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। ১৪৫টি আধুনিক সামরিক বাহিনীকে মূল্যায়ন করে তৈরি এই সূচক অনুযায়ী, এই তিন দেশের মোট সচল সেনা সংখ্যা ১৪ লাখ, ট্যাংক ৬,০০০-এর বেশি, সামরিক বিমান ৩,৪১৫টি, নৌবাহিনীর যুদ্ধযান ৮৪৪টি এবং সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাজেট ১২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
তুলনামূলকভাবে, জিএফআই সূচকে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের পরেই চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। ভারতের রয়েছে ১৪ লাখ সচল সেনা, ৮৬ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট, ৩৪৩টি নৌযান, ৩,৯১৩টি ট্যাংক এবং ২,১৮৩টি যুদ্ধবিমান। আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও, কোনো সংকটে যদি এই মক্কা চুক্তি ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয় করা হয়, তবে তা দিল্লির সামরিক সক্ষমতার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা চুক্তিটি কোনো একক শত্রুকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়নি। ইসরায়েল বাদে (তাত্ত্বিকভাবে) এমন কোনো সাধারণ শত্রু নেই যার বিরুদ্ধে এই তিন দেশ একযোগে লড়াই করতে পারে। বরং এই চুক্তিটি মূলত বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার একটি কৌশল। এটি হতে পারে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে একটি বার্তা যে, তারা আর মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাশা ছিল সৌদি আরব হয়তো আব্রাহাম অ্যাকর্ডে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করবে, কিন্তু রিয়াদ সম্ভবত সেই পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। একইভাবে, তুরস্কও ইসরায়েলের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ন্যাটোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন বার্তা দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে ট্রাম্প প্রশাসনের সুনজরে থাকা পাকিস্তান এই বার্তার মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা সত্ত্বেও সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে চাইছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে নিরাপত্তা ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে এই চুক্তিকে স্বাগত জানালেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াবে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। এই জোট ভবিষ্যতে আরও মুসলিম দেশকে আকৃষ্ট করতে পারে। এর ফলে ভারতের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযান বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে প্রস্তাবিত 'ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর' (আইএমইসি) প্রকল্প হুমকির মুখে পড়তে পারে। আঙ্কারা ও রিয়াদের সমর্থন পেয়ে পাকিস্তান আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে উঠলে ভারতের সন্ত্রাসমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ব্যাহত হতে পারে। তাই এই পরিস্থিতিতে দিল্লির জন্য কেবল 'অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ' নীতি কার্যকর হবে না।
নয়াদিল্লিকে এখন স্বীকার করতে হবে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা বাড়লেও সেখানে তাদের কৌশলগত নীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রয়োজন। এ পর্যন্ত ভারতের পশ্চিম এশিয়া নীতি মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আই২ইউ২ (ভারত, ইসরায়েল, ইউএই ও যুক্তরাষ্ট্র) জোটের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু মক্কা চুক্তি এই কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ফুটিয়ে তুলেছে। ভারতকে এখন ওমান, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোর সঙ্গে এককভাবে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়াতে হবে, যাতে এডেন উপসাগর, লোহিত সাগর এবং ওমান উপসাগরে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে এই পরিবর্তনকে শুধু ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে ভারতকে একটি অপরিহার্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।


























