লন্ডনের একটি পাবে গিয়ে গ্রেগ ডাবল নামের এক ব্যক্তি ব্রিটিশ বকশিস বা টিপিং সংস্কৃতির এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এক গ্লাস বিয়ারের দাম আট পাউন্ড হওয়ার কারণেই তিনি বেশ বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু যখন বিলের সাথে বাড়তি সার্ভিস চার্জ যোগ করা হলো, তখন তার ক্ষোভ আর ধরে রাখা যায়নি। গ্রেগ বলেন, "বিয়ারের দাম এমনিতেই বেশি, তার ওপর আবার সার্ভিস চার্জ চাপিয়ে দেওয়াটা একেবারে অপরাধের মতো।" অতীতে যুক্তরাজ্যের পাবগুলোতে সাধারণত খুচরা পয়সা রেখে দেওয়া বা কর্মীদের নিজের পছন্দে পানীয় কিনে নেওয়ার কথা বলা হতো। কিন্তু এখন পাব, কফি শপ বা সেলফ-সার্ভিস মেশিনেও নিয়মিত বকশিস দেওয়ার এই নতুন প্রবণতা বা 'টিপ ক্রিপ' গ্রাহকদের ভাবিয়ে তুলছে।
যুক্তরাজ্যে একসময় রেস্তোরাঁয় ১০ শতাংশ বকশিস দেওয়াই ছিল সাধারণ নিয়ম। তবে হেয়ারড্রেসার, বেবিসিটার বা খাবার সরবরাহকারীকে বকশিস দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা কাজ করত। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঘন ঘন বকশিস চাওয়ার প্রবণতা ব্রিটিশদের জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অভিজাত লন্ডনের রেস্তোরাঁগুলোতে এখন ১৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ নেওয়া খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনেক কফি শপে সেবা পাওয়ার আগেই বিল পরিশোধের সময় বকশিস চেয়ে বসা হচ্ছে।
বকশিস দেওয়ার এই আচরণ কেবল সামাজিক নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রাজনীতি ও অর্থনীতিও জড়িত। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে গ্রেট ব্রিটেনে একটি নতুন আইন কার্যকর হয়েছে, যার অধীনে সমস্ত সার্ভিস চার্জ এবং বকশিস সরাসরি কর্মীদের দিতে হবে। এটি কম বেতনের কর্মীদের আয় বাড়াতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, ন্যূনতম মজুরি এবং জাতীয় বীমা বৃদ্ধির কারণে চাপে থাকা আতিথেয়তা খাতের ব্যবসাগুলোও এতে খুশি। কারণ বকশিসের মাধ্যমে গ্রাহকরাই কর্মীদের বেতনের একটি অংশ পরিশোধ করে দিচ্ছেন। সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলের সাথে 'ঐচ্ছিক' সার্ভিস চার্জ যোগ করলে কর এড়ানো যায়, কর্মীদের পকেটে বেশি টাকা যায় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাবারের দাম বাড়াতে হয় না।
তবে কার্ড মেশিন হাতে নিয়ে যখন কোনো কর্মী গ্রাহকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন এই সার্ভিস চার্জ কতটা 'ঐচ্ছিক' থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর গ্রেগ ডাবল জানান, টেবিল সার্ভিস ছাড়া কফি শপে তিনি সাধারণত বকশিস দেন না। তবে সেখানে বসে দীর্ঘ সময় কাজ করলে তিনি কিছুটা বকশিস দিতে পারেন। একইভাবে, কাউন্টার থেকে নিজে পানীয় কিনে নিলে তিনি বকশিস দেন না, তবে বন্ধুদের জন্য বড় অর্ডার দিলে দিতে পারেন। বিশেষ করে গিনেস বিয়ারের মতো পানীয় তৈরি করতে সময় লাগার কারণে কর্মীরা বকশিস আশা করেন।
পেমেন্ট মেশিনের স্ক্রিনে যখন তিনটি অপশন ভেসে ওঠে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ অপশনটি হয়তো ৩৫ শতাংশ বকশিসের, তখন অনেকেই ঘাবড়ে গিয়ে মাঝের অপশনটি বেছে নেন। কম বকশিস দিয়ে কৃপণ হিসেবে পরিচিত হতে না চাওয়ার এই মানসিকতার কারণে অনেকেই প্রায় ২০ শতাংশ বা তার বেশি বকশিস দিতে বাধ্য হন। এই প্রযুক্তির পেছনে থাকা ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিটি লেনদেন থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে নেয়। ফলে এই টিপিং সংস্কৃতির প্রসারে তাদেরও একটি বড় আর্থিক স্বার্থ রয়েছে। প্রযুক্তি গবেষক ভাইনস জানান, মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে তাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধও আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের সামাজিক প্রত্যাশাকে বদলে দিচ্ছে।
লিংকনশায়ারের একটি পাবে কর্মরত পিটার জানান, গ্রাহকদের কাছে বকশিস চাওয়াটা বেশ বিব্রতকর। কয়েক মাস আগে তাদের পাবে নতুন কার্ড মেশিন আনা হয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বকশিস যোগ করার অপশন দেখায়। পিটার সাধারণত গ্রাহকদের হাতে মেশিন দেওয়ার আগেই নিজেই 'নো' বাটন চেপে দেন। তিনি বলেন, "এটি মানুষকে বিরক্ত করতে পারে। সেবা ভালো হলে তবেই বকশিস দেওয়া উচিত, কেবল এক গ্লাস বিয়ার ঢেলে দেওয়ার জন্য বকশিস দেওয়া যায় না।"
কর্নেল ইউনিভার্সিটির ভোক্তা আচরণ ও বিপণন বিষয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মাইকেল লিন জানান, করোনা মহামারির সময় এই বকশিস সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন আসে। মহামারির সময় মানুষ এক ধরনের 'ঝুঁকি ভাতা' হিসেবে এবং আর্থিক সংকটে থাকা কর্মীদের সহায়তার জন্য বকশিস দেওয়া শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে স্থায়ী রূপ দেয়। লিন আরও জানান, নগরায়ণ এবং ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসারের কারণে বকশিসের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। নগদ টাকার চেয়ে কার্ডে পেমেন্ট করলে মানুষ বেশি বকশিস দেয়।
যুক্তরাজ্যের মানুষ তাদের হেয়ারড্রেসারকে বকশিস দিতে দ্বিধা করলেও প্লাম্বার, ডেন্টিস্ট বা আইনজীবীকে সাধারণত বকশিস দেয় না। লিন এর ব্যাখ্যায় বলেন, সাধারণত যাদের আর্থিক অবস্থা আমাদের চেয়ে ভালো বা যারা আমাদের বড় কোনো সমস্যার সমাধান করছেন, তাদের আমরা বকশিস দিই না। কিন্তু আতিথেয়তা বা চুল কাটার মতো ইতিবাচক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে আমরা বকশিস দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। নৃবিজ্ঞানী জর্জ এম ফস্টারের মতে, বকশিস দেওয়ার সূচনা হয়েছিল মূলত কর্মীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জন্য, যাতে তারা মনে না করেন যে গ্রাহকরা যখন আনন্দ করছেন তখন তারা কেবল কষ্টকর কাজ করছেন।
তবে এই বকশিস দেওয়ার ক্ষেত্রে অবচেতনভাবে বর্ণ ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও কাজ করে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষ্ণাঙ্গ কর্মী বা চালকরা কম বকশিস পান। আবার নারী কর্মীরা পুরুষদের তুলনায় এবং আকর্ষণীয় চেহারার কর্মীরা অন্যদের চেয়ে বেশি বকশিস পেয়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ব্রিটিশ ফুটবল ভক্তরা এই বকশিস সংস্কৃতি দেখে বেশ অবাক ও বিরক্ত হয়েছেন। কনটেন্ট ক্রিয়েটর অলি থমাস জানান, যুক্তরাষ্ট্রে বকশিস দেওয়ার চাপ অনেক বেশি কারণ সেখানকার কর্মীদের মূল বেতন খুবই কম। অন্যদিকে লন্ডনে জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী বেতন কিছুটা বেশি হওয়ায় গ্রাহকদের ওপর সেই চাপ কম থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রেও বকশিস নিয়ে ক্লান্তি বা 'টিপ ফ্যাটিগ' এখন বাস্তব রূপ নিয়েছে বলে জানান লিন। তিনি বলেন, "জরিপে আমি মানুষকে জিজ্ঞেস করছিলাম: আপনারা কি বকশিস প্রথা পুরোপুরি বাতিল করতে চান? ২০১৬ সালে প্রায় ৩২ শতাংশ মানুষ এর পক্ষে ছিলেন। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ শতাংশে এবং ২০২২ সালের মধ্যে তা ৫২ শতাংশে পৌঁছায়।"
শিষ্টাচার বিশেষজ্ঞ জো ব্রায়ান্টের মতে, পাব বা কফি শপে টেবিল সার্ভিস ছাড়া বকশিস দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। সরাসরি এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে 'নো' বাটন চেপে দেওয়াটাই শ্রেয়। আর গৃহকর্মী বা সন্তানদের দেখাশোনাকারীদের ক্ষেত্রে বছরের বিভিন্ন সময়ে বকশিস না দিয়ে বড়দিনের সময় একটি বড় উপহার বা বোনাস দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, এই কারণেই আমাদের দেশে কখনও বকশিস সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি—এবং এটি কেন এত অস্বস্তিকর মনে হয়। "আমরা সবাই মানিব্যাগ বের করে মানুষের হাতে টাকা দেওয়াটাকে খুবই নির্লজ্জ কাজ বলে মনে করি… আমরা এক ধরণের অস্পষ্ট বা ধূসর এলাকার মধ্যে পড়ে গেছি।" ব্রিটিশরা টাকা-পয়সা, সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণী নিয়ে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করে বলেই এই বকশিস সংস্কৃতি তাদের কাছে এত অস্বস্তিকর মনে হয়।































