চট্টগ্রামে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস এবং জলাবদ্ধতা দীর্ঘদিনের বড় দুটি আতঙ্ক। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আট বছর আগে ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন একটি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। পাহাড়ের ক্ষয় রোধে ‘ভেটিভার’ বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বিন্না ঘাস’ রোপণের এই পরীক্ষামূলক প্রকল্পটির উদ্বোধন করতে থাইল্যান্ডের রাজকুমারী মহা চক্রী সিরিনধরন নিজে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। তৎকালীন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমদের উদ্যোগে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল।
২০১৮ সালের ৩০ মে টাইগারপাস এলাকার বাটালি হিলের মিঠা পাহাড়ের পাদদেশে রাজকুমারী সিরিনধরন নিজ হাতে বিন্না ঘাসের চারা রোপণ করেন। একই সঙ্গে সেখানে ‘বিন্না ঘাস উন্নয়ন কেন্দ্র’ বা ভেটিভার সেন্টার, প্রশিক্ষণ শেড এবং প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল, পরীক্ষামূলকভাবে সফল হলে নগরের অন্যান্য ক্ষয়প্রবণ পাহাড়েও এই ঘাস ছড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রকল্পটিতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।
এই পরীক্ষামূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ২৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল, যার মধ্যে ২০ লাখ টাকা দিয়েছিল থাই সরকার এবং বাকি ৮ লাখ টাকা সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হয়। তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকল্পের জন্য দুই কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিলেও পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ আর ছাড় হয়নি। ফলে গবেষণামূলক কার্যক্রমের বাইরে প্রকল্পটি আর সম্প্রসারিত হতে পারেনি।
প্রকল্পটি শুরুর তিন বছরের মাথায় ২০২১ সালে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল অর্থায়নের অভাব এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক পরিবর্তন। তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সময়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও, ২০২১ সালে মো. রেজাউল করিম চৌধুরী মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক পর্যায়ে আগ্রহ কমে যায়। সেই সঙ্গে প্রধান প্রকৌশলীসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হওয়ায় প্রকল্পটি তদারকির অভাবে পড়ে যায়।
বর্তমানে সরেজমিনে দেখা যায়, ভেটিভার সেন্টারের ভবনটি টিকে থাকলেও সেখানে প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম নেই। কেন্দ্রটি এখন সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রদর্শনী প্লটের একটি অংশে গুদাম তৈরি করা হয়েছে এবং অন্য অংশে ফুলের চারা রোপণ করা হয়েছে। তবে কিছু জায়গায় এখনো বিন্না ঘাসের অস্তিত্ব দেখা যায়। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত এক প্রকৌশলী জানান, যেসব অংশে বিন্না ঘাস লাগানো হয়েছিল, সেখানে পাহাড়ধসের প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল। নগরের পাহাড়ে এই ঘাস ছড়িয়ে দিলে পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতা—উভয় সমস্যারই সমাধান মিলত।
বিন্না ঘাস বা ভেটিভারের শিকড় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দীর্ঘ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে এই ঘাসের শিকড় মাটির ৬ থেকে ১০ ফুট গভীরে চলে যেতে পারে, যা মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকায় নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় রোধে বিশ্বজুড়ে এটি একটি পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে স্বীকৃত।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে বিন্না ঘাস নিয়ে সরকারের নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় নদীভাঙন, বাঁধের ঢাল ও ভূমিক্ষয় রোধে বিন্না ঘাসের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি ‘বিন্না ঘাস পলিসি ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক সভায় পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এই ঘাস রোপণের ওপর জোর দিয়েছেন। সরকারের এই নতুন অবস্থানের প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এখন পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা কয়েকটি পাহাড়ে পুনরায় পরীক্ষামূলকভাবে বিন্না ঘাস রোপণের পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতি বছরই নগরে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিদেশে ‘ভেটিভার’ নামে পরিচিত এই ঘাস পাহাড়ের ক্ষয়রোধে খুব ভালো কাজ করে বলে গবেষকেরা একে ‘জাদুর ঘাস’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেদিন তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের হাতেও বিন্না ঘাস তুলে দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভেটিভার সেন্টারে স্থাপন করা হয়েছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার নানা সরঞ্জাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্য পাহাড়গুলোতে এই ঘাস রোপণ করা গেলে একদিকে পাহাড়ধসের ঝুঁকি কমত, অন্যদিকে জলাবদ্ধতার ভোগান্তিও কমে আসত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কারণ, পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটি ও বালু নালা-নর্দমা ও খালে জমে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গেও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এ ঘাসের।
সূত্র: প্রথম আলো































