পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়ম লঙ্ঘন করে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর ছয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এই কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ধারা অব্যাহত থাকায় বিপিসি ও এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তীব্র অসন্তোষ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন উপমহাব্যবস্থাপক এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন এবং ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার আমেনা ফেরদৌসী ও ইসতিয়াক হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরির নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই উচ্চতর গ্রেডের বেতন ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করায় রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। এছাড়া, এদের মধ্যে কারো কারো বিরুদ্ধে বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও দলীয় সুপারিশে নিয়োগ পাওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিপিসির চাকরি প্রবিধানমালা-১৯৮৯ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপক পদে ৫০ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে। কিন্তু বিপিসি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই পদে সরাসরি নিয়োগ না দিয়ে শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। ২০২১ সালের ১৩ এপ্রিল সিনিয়র সিলেকশন কমিটির সুপারিশে পাঁচজন উপব্যবস্থাপককে ৬ মে সরাসরি ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যা প্রবিধানমালার সরাসরি লঙ্ঘন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২ জুলাই এস এম জুবায়ের হাসান, সিরাজাম মুনীরা ও মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনকে উপমহাব্যবস্থাপক পদে এবং ১০ জুলাই ইসতিয়াক হোসেনকে ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
প্রবিধানমালা অনুযায়ী, উপব্যবস্থাপক পদে পূর্ণ গ্রেড পেতে পাঁচ বছর, ব্যবস্থাপক পদে ১০ বছর এবং উপমহাব্যবস্থাপক পদে ১২ বছর চাকরিকাল পূর্ণ হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ছয় কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ের দুই থেকে তিন বছর আগেই উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ দুর্নীতি হিসেবে অভিহিত করে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন।
এস এম জুবায়ের হাসান ২০১০ সালের ১ নভেম্বর সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৪ সালের ২৬ জুন তিনি উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান, যেখানে তার চাকরিকাল ছিল তিন বছর সাত মাস ২৫ দিন। অর্থাৎ, পাঁচ বছরের শর্ত পূরণ হওয়ার ১৬ মাস আগেই তিনি উচ্চতর গ্রেডের সব সুবিধা ভোগ শুরু করেন। তবে জুবায়ের হাসানের দাবি, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিলেকশন বোর্ড যাচাই-বাছাই করেই পদোন্নতি দিয়েছে এবং কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়নি। তিনি একে একটি গোষ্ঠীর ভুয়া অভিযোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ১৩ আগস্ট যোগদানের সময় তার বয়স ছিল ৩৪ বছর পাঁচ মাস ছয়দিন, অথচ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ৩৩ বছর। তিনি প্রায় ১৭ মাস বয়সসীমা অতিক্রম করে চাকরিতে প্রবেশ করেন। এছাড়া, ব্যবস্থাপক পদে ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ছয় বছর আট মাস ১৪ দিনে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ৩৯ মাস অতিরিক্ত সুবিধা নিয়েছেন। নাজিম উদ্দীনের ভাষ্যমতে, নিয়োগ ও পদোন্নতি বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদারকি করে, তাই নিয়ম লঙ্ঘনের সুযোগ নেই।
সিরাজাম মুনীরার ক্ষেত্রেও একই চিত্র পাওয়া যায়। ২০১৪ সালের ২৯ জুন যোগদানের সময় তার বয়স ছিল ৩৩ বছর সাত মাস ৩০ দিন, যা নির্ধারিত বয়সসীমার বাইরে। ব্যবস্থাপক পদে ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের ২৯ জুন হলেও তিনি ৩৮ মাস আগেই উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা নিয়েছেন। এছাড়া উপমহাব্যবস্থাপক পদে ১২ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, তার জানা মতে কোনো নিয়ম লঙ্ঘন হয়নি এবং বিপিসির সাচিবিক বিভাগে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন।
অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে মিজানুর রহমান ও আমেনা ফেরদৌসী ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার সময় তাদের চাকরিকাল ছিল তিন বছর আট মাস ১৫ দিন, অথচ পাঁচ বছরের শর্ত অনুযায়ী তাদের আরও ১৬ মাস অপেক্ষা করার কথা ছিল। এছাড়া ইসতিয়াক হোসেন ২০১৬ সালের ২৭ জুন উপব্যবস্থাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই ব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।
সার্বিক বিষয়ে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা জানিয়েছেন, ছয় কর্মকর্তার নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিযোগটি তাদের কাছে এসেছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিনি আরও বলেন, তদন্ত চলমান থাকায় বিস্তারিত মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রমাণিত না হলে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে। বিপিসিতে নিয়মবহির্ভূত কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের পতন হলেও পদোন্নতির এই ধারা ধরে রেখেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিপিসির ৬ বিতর্কিত কর্মকর্তা।
অর্থাৎ তিনি ১৬ মাস আগে থেকেই উচ্চতর গ্রেডের পূর্ণ বেতন, বাড়িভাড়া, যাতায়াত, উৎসব ভাতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা ভোগ করেন।
অথচ তার পূর্ণ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জনের সময় ছিল ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর।
মানুষ তেল পায় না, গ্যাসের জন্য দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
আর এই সেক্টরের কর্মকর্তারা ব্রুনাই রাজার মতো চলাফেরা করে।
তাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করবে তারাও তাদের অধীনস্তের মতো আচরণ করে।
এ ধরনের অনিয়মের বিচার না হলে জ্বালানি খাতের শৃঙ্খলা ফিরবে না।
এখানে মেয়াদপূর্তি কিংবা অন্যকোনো বিধান লঙ্ঘন করা হয়নি।
বরং বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আমাদেরকে বঞ্চিতই করা হয়েছে।
একটি গোষ্ঠী বেশ কিছু ভুয়া অভিযোগ লিখে বিভিন্ন দপ্তরে উড়ো চিঠি দিয়ে আমাদের কয়েকজনকে হয়রানি করছে।
আপনার কাছেও ওই উড়ো চিঠি আর বায়বীয় অভিযোগ পাঠানো হয়েছে।
বিধি বিধান মানলে তার এই পদের সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ১৩ আগস্ট থেকে।
তারা নিশ্চয় কোনো প্রবিধান লঙ্ঘন করে কাউকে নিয়োগ কিংবা পদোন্নতি দেবেন না।
কিন্তু পদোন্নতির সময় তার মোট চাকরিকাল ছিল মাত্র ১১ বছর তিন দিন।
এ ব্যাপারে সিরাজাম মুনীরা জানান, আমার জানা মতে আমার নিয়োগ কিংবা পদোন্নতিতে কোন ধরনের নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি।
তারপরও আপনাদের কাছে এমন ডকুমেন্ট থাকলে বিপিসির সাচিবিক বিভাগে যোগাযোগ করে বিষয়টি যাচাই বাছাই করে দেখতে পারেন।
যেখানে ওই বেতন গ্রেডে পূর্ণ বেতন পাওয়ার ন্যূনতম সময়কাল ৫ বছর।
কিন্তু দুই কর্মকর্তাই উচ্চতর বেতন গ্রেডের ন্যুনতম সময় পার হওয়ার ১৬ মাস আগেই বেতনসহ আনুষঙ্গিক সব সুবিধা গ্রহণ করেন।
ওই সময়ে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল কিংবা পরে।
তাদের ক্ষেত্রেও উচ্চতর পদোন্নতির জন্য চাকরিকাল ন্যূনতম মেয়াদ ১০ বছর মানা হয়নি।
আমরা অভিযোগের বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি।
তারপরও এমন ঘটনা ঘটলে তদন্তে তা অবশ্যই বেরিয়ে আসবে।
সূত্র: Daily Amar Desh




























