সাউথ ক্যারোলাইনার সিনেটর ডার্লিন গ্রাহাম এক ব্যতিক্রমী নির্বাচনী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। প্রয়াত ভাই লিন্ডসি গ্রাহামের শূন্য আসনটি পূরণের জন্য গত ১৩ জুলাই গভর্নর হেনরি ম্যাকমাস্টার তাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধেই এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে রাজনীতিতে একেবারেই নতুন ডার্লিন গ্রাহামকে এবার ভোটারদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আগামী ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য বিশেষ রানিং-অফ নির্বাচনে কট্টর রক্ষণশীল প্রতিনিধি রালফ নরম্যানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট এই প্রার্থী টিকে থাকতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
গ্রাহামের জয় হবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবের এক বড় প্রমাণ। যদিও সম্প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া বেশ কয়েকজন প্রার্থী প্রাথমিক বাছাইয়ে হেরে গেছেন। একই সঙ্গে এটি হবে লিন্ডসি গ্রাহামের প্রতি সাউথ ক্যারোলাইনার মানুষের দীর্ঘদিনের আনুগত্যের পরীক্ষা, যাকে তারা চারবার সিনেটে পাঠিয়েছিলেন। গত ১১ আগস্টের প্রাথমিক বাছাইয়ে ডার্লিন গ্রাহাম প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন এবং নরম্যান পান ২৫ শতাংশের কিছু কম ভোট। কোনো প্রার্থীই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় শীর্ষ এই দুই প্রার্থী রানিং-অফে উন্নীত হন। তারা পেছনে ফেলেন প্রতিনিধি রাসেল ফ্রাই, সাউথ ক্যারোলাইনার সাবেক গভর্নর মার্ক স্যানফোর্ড এবং ব্যবসায়ী মার্ক লিঞ্চকে।
৬২ বছর বয়সী ডার্লিন গ্রাহাম রাজনীতিতে আসার আগে প্রতিবন্ধী সেবা ও কর্মসংস্থান উন্নয়ন খাতে অপটিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন। তিনি সাউথ ক্যারোলাইনা স্টেট ওয়ার্কফোর্স ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল অব স্টেট এজেন্সিস ফর দ্য ব্লাইন্ডের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত ১৮ আগস্টের এক বিতর্কে, যখন তাকে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কি না তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
সে সময় ডার্লিন গ্রাহাম বলেন, "জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আমি খুব একটা অবগত নই, তবে আমি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করি। আমি এখানে কোনো ঝানু রাজনীতিবিদ নই। জাতীয় নিরাপত্তা আমার কাজ নয়, এটি আমার দক্ষতার ক্ষেত্রও নয়, তবে আমি সামরিক বাহিনীকে সমর্থন করি।" গ্রাহামের এই মন্তব্য বিশেষভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে কারণ তার প্রয়াত ভাই লিন্ডসি গ্রাহাম ছিলেন মার্কিন রাজনীতির অন্যতম কট্টর পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ।
এই নির্বাচন নিয়ে জনমত জরিপের সংখ্যা খুবই কম, যা কৌতুহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফারম্যান ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল ভিনসন বলেন, "আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। গ্রাহাম কি আবেগের ভোট এবং ট্রাম্পের প্রতি তার আনুগত্যের জোরে জয়ী হতে পারবেন, নাকি ভোটাররা ভিন্ন কিছু চাইবেন? এই লড়াইটি নিশ্চিতভাবেই একটি কঠিন সমীকরণ।"
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রানিং-অফ নির্বাচন হবে ট্রাম্পের সমর্থনের কার্যকারিতার একটি বড় পরীক্ষা। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কার্ক রানডাজো বলেন, "আপনি যদি আমাকে এক সপ্তাহ আগে জিজ্ঞেস করতেন, তবে আমি বলতাম ট্রাম্পের সমর্থনের কারণে গ্রাহাম সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। কিন্তু ডিবেটে তার ভুল এবং নরম্যান সেটিকে কাজে লাগানোর পর, শেষ মুহূর্তের লড়াইটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি জমজমাট হয়ে উঠেছে। আমাকে যদি বলতেই হয়, তবে আমি নরম্যানকে সামান্য এগিয়ে রাখব। তবে এটি খুবই সামান্য ব্যবধান। মঙ্গলবারে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।"
গত ২১ আগস্ট সাউথ ক্যারোলাইনার মার্টল বিচে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প গ্রাহামের জয়ের ওপর বিশেষ জোর দেন। সমাবেশে ট্রাম্প ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, "তাই আমি সত্যিই চাই আপনারা এমনভাবে ভাবুন যেন আমি নিজেই ব্যালটে আছি। দয়া করে আসুন এবং ভোট দিন। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু মনে করুন আমি আরও একবার ব্যালটে আছি। আপনাদের এটি বলতে হবে এবং বাইরে এসে ভোট দিতে হবে।" এরপর ২৪ আগস্টের এক টেলি-র্যালিতে ট্রাম্প বলেন, ডার্লিন গ্রাহাম "ট্রাম্পের এজেন্ডাকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করে।" ট্রাম্প আরও বলেন, "আমি নিজেই তাকে এটি করতে বলেছিলাম। আমিই তাকে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে এসেছি। আমাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন সে জয়ী হয়, কারণ তার চেয়ে ভালো আর কেউ হতে পারে না।"
ব্যালটপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের সমর্থন করা প্রার্থীদের জয়ের হার বেশ ভালো। তাদের মধ্যে রয়েছেন জর্জিয়ার সিনেট মনোনীত প্রার্থী মাইক কলিন্স, টেক্সাসের সিনেট মনোনীত প্রার্থী কেন প্যাক্সটন এবং নিউ ইয়র্কের কংগ্রেস প্রার্থী অ্যান্থনি কনস্ট্যান্টিনো। তবে মিনেসোটার গভর্নর পদপ্রার্থী মাইক লিন্ডেল, টেনেসির প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস এবং মিশিগানের কংগ্রেস প্রার্থী আমির হাসানের মতো প্রার্থীদের পরাজয় ট্রাম্পের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যদিও ট্রাম্প গত ২৩ আগস্ট ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দাবি করেন, "আমার সমর্থন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী—তাছাড়া এমন ভালো মানুষেরা নির্বাচিত হচ্ছেন যারা আগে কখনো সুযোগ পাননি!"
ক্ল্যাফ্লিন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কুয়াদও পকু-অ্যাজিয়েমাং মনে করেন, ট্রাম্পের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও গ্রাহাম মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে রানিং-অফে গেছেন, যা প্রমাণ করে তিনি সব রিপাবলিকান ভোটারকে টানতে পারছেন না। তিনি বলেন, "রিপাবলিকান ভোটারদের ওপর তার নিজস্ব কোনো প্রভাব আছে বলে মনে হয় না; ট্রাম্পের সমর্থনই তার একমাত্র ভরসা।" পকু-অ্যাজিয়েমাং আরও জানান, প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়া অন্য তিন প্রার্থীর প্রায় ২৭,০০০ ভোট নরম্যানের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে রাসেল ফ্রাই গ্রাহামকে সমর্থন দিলেও স্যানফোর্ড এবং লিঞ্চ হাউস ফ্রিডম ককাসের সদস্য নরম্যানকে সমর্থন দিয়েছেন।
ভোটারদের ক্লান্তিও এই নির্বাচনে একটি বড় প্রভাব ফেলতে পারে। গত ৯ জুন লিন্ডসি গ্রাহাম রিপাবলিকান প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ১১ জুলাই মহাধমনী ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে তার আকস্মিক মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। অধ্যাপক ড্যানিয়েল ভিনসন জানান, গত ১১ আগস্টের বিশেষ প্রাইমারিতে মাত্র ১১ শতাংশ নিবন্ধিত রিপাবলিকান ভোটার ভোট দিয়েছেন। রানিং-অফে এই হার আরও কমতে পারে।
উইনথ্রপ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক স্কট হাফমন মনে করেন, কট্টরপন্থীরা নরম্যানকে পছন্দ করবেন কারণ তিনি একজন পরিবর্তনকামী প্রার্থী। তবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রচার গ্রাহামের প্রতি তার আস্থার প্রমাণ দেয়। হাফমন বলেন, "এই লড়াইয়ের ফলাফল নির্ভর করছে নরম্যানের সমর্থকরা ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন কি না, অথবা ট্রাম্পের অন্ধ ভক্তরা ডার্লিন গ্রাহামের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক জ্ঞানকে তোয়াক্কা না করে তাকে ভোট দিতে আসেন কি না তার ওপর।"
এই বিশেষ রিপাবলিকান রানিং-অফে যিনিই জয়ী হবেন, তিনি আগামী নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক মনোনীত প্রার্থী ও পেশায় চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রিউজের মুখোমুখি হবেন, যিনি রাজনীতিতে একেবারেই নতুন।


























