"কুইন অব কান্ট্রি" খ্যাত বিশ্বনন্দিত সংগীতশিল্পী ডলি পার্টন আর নেই। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর নজরকাড়া সোনালী চুল, জমকালো পোশাক এবং অনন্য কণ্ঠস্বরের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এই মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে এবং পরে ইউএসএ টুডের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
দীর্ঘ ৬০ বছরের গৌরবময় ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়েছেন। তাঁর গাওয়া "জোলেন" (Jolene), "আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ" (I Will Always Love You), "নাইন টু ফাইভ" (9 to 5) এবং "কোট অব মেনি কালারস" (Coat of Many Colors) বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁর ৪৯টি স্টুডিও অ্যালবামের মধ্যে ২৫টি গান বিলবোর্ডের "হট কান্ট্রি সংস" চার্টের শীর্ষে স্থান পায়, যা যেকোনো নারী কান্ট্রি শিল্পীর জন্য সর্বোচ্চ রেকর্ড। ১৯৭১ সালের "জশুয়া" (Joshua) থেকে শুরু করে ২০২৪ সালে বিয়ন্সের সাথে গাওয়া "টাইর্যান্ট" (Tyrant) পর্যন্ত প্রতিটি দশকে তাঁর গান চার্টের শীর্ষে রাজত্ব করেছে।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ডলি পার্টন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার লাভ করেন, যার মধ্যে আজীবন সম্মাননাও রয়েছে। কেবল সংগীতেই নয়, অভিনয়ের জগতেও তাঁর পদচারণা ছিল দারুণ সফল। ১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সাথে "নাইন টু ফাইভ" চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাঁর রূপালী পর্দায় অভিষেক ঘটে। এরপর তিনি বার্ট রেনল্ডসের সাথে "বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস" (১৯৮২) এবং স্যালি ফিল্ড ও শার্লি ম্যাকলাইনের সাথে "স্টিল ম্যাগনোলিয়াস" (১৯৮৯) সহ ২০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় ও ক্যামিও চরিত্রে অংশ নেন।
তারকা খ্যাতির বাইরে ডলি পার্টন ছিলেন এক মহান সমাজসেবক ও দানবীর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত "ডলিউড ফাউন্ডেশন"-এর মাধ্যমে তিনি কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য লাখ লাখ ডলারের বৃত্তি দিয়েছেন। ১৯৯৫ সালে শুরু করা তাঁর "ইমাজিনেশন লাইব্রেরি" প্রকল্পের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুদের বিনামূল্যে প্রায় ২০ কোটি বই বিতরণ করা হয়েছে। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময়ে মডার্না ভ্যাকসিনের গবেষণার জন্য তিনি ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৪ সালে হারিকেন হেলেনের বন্যায় টেনেসির ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তায় তিনি আরও ১০ লাখ ডলার দান করেন। সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ২০২৫ সালের "জিন হারশল্ট হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাওয়ার্ড" (সম্মানসূচক অস্কার) প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছিল।
ডলি পার্টনের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতাও ছিল প্রশংসনীয়। ১৯৮৬ সালে টেনেসির পিজিয়ন ফোর্জে তিনি গড়ে তোলেন থিম পার্ক "ডলিউড"। পার্কটি মূলত ১৯৬১ সালে "রেবেল রেলরোড" নামে চালু হয়েছিল, যা ১৯৭০ সালে "গোল্ডরাশ জাংশন" এবং ১৯৭৬ সালে "সিলভার ডলার সিটি" নাম ধারণ করে। পরবর্তীতে পার্টন জ্যাক ও পিট হারশেন্ড ভাইদের সাথে যুক্ত হয়ে এটিকে ডলিউডে রূপান্তর করার পর দর্শনার্থী সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১.৩ মিলিয়নে পৌঁছায়। বর্তমানে এই পার্কে বার্ষিক ৩০ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী আসেন এবং এটি বছরে ১.৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক অবদান রাখার পাশাপাশি ২৩,০০০ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। ডলিউড ছাড়াও তাঁর ব্যবসার পরিধি হোটেল, ডিঙ্কান হাইনস বেকিং কিট, সুগন্ধি, প্রসাধন সামগ্রী, ওয়াইন এবং পোশাকের ব্র্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
অবসরের বিষয়ে ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "আমি কখনই অবসর নেব না। আশা করি কোনো একদিন মঞ্চে গান গাইতে গাইতেই আমি মারা যাব, বিশেষ করে নিজের লেখা কোনো গান গাওয়ার সময়।" ২০২২ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তিনি তাঁর শেষ অ্যালবাম "রকস্টার" প্রকাশ করেন, যেখানে পল ম্যাককার্টনি, স্টিভি নিক্স, স্টিং এবং তাঁর ধর্মকন্যা মাইলি সাইরাসের মতো তারকারা অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৫৯ সালে "পাপি লাভ" দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা ডলি পার্টন ২০০টিরও বেশি একক গান প্রকাশ করেছেন।
ডলি পার্টনের লেখা "আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ" গানটি বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা একটি সৃষ্টি। গানটি তিনি লিখেছিলেন তাঁর তৎকালীন ব্যবসায়িক অংশীদার পোর্টার ওয়াগনারের বিদায়লগ্নে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে "দ্য বডিগার্ড" চলচ্চিত্রের জন্য হুইটনি হিউস্টন এই গানটি গেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এই গানের রয়্যালটি থেকে ডলি পার্টন নব্বইয়ের দশকে ১ কোটি ডলারের বেশি আয় করেন, যা তিনি ন্যাশভিলের একটি কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় শপিং মল ও অফিস কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, "আমি হুইটনির মানুষের সাথে থাকতে চেয়েছিলাম, যারা আমারও মানুষ। তাই আমি মনে করি, এটি হুইটনির তৈরি করা বাড়ি।" এছাড়া টিনা টার্নারের ১৯৭৪ সালের কান্ট্রি অ্যালবাম এবং মাইলি সাইরাসের সাথে তাঁর ২০১৭ সালের গান "রেইনবোল্যান্ড" সহ বিভিন্ন ধারার শিল্পীদের জন্য তিনি গান লিখেছেন।
১৯৪৬ সালে টেনেসির লোকাস্ট রিজে জন্ম নেওয়া ডলি পার্টন ছিলেন বাবা-মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। ১৯৬৪ সালে ন্যাশভিলে আসার প্রথম দিনেই তাঁর পরিচয় হয় কার্ল ডিনের সাথে। ১৯৬৬ সালে তাঁরা জর্জিয়ার রিংগোল্ডে গোপনে বিয়ে করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন প্রায় ৬০ বছর স্থায়ী ছিল। কার্ল ডিন ৮২ বছর বয়সে মারা যান। স্বামীর প্রয়াণের পর ডলি পার্টন বলেছিলেন, "আমি তাঁকে সবসময় ভালোবেসে যাব এবং তাঁকে খুব মিস করব।"
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলি পার্টন বেশ কিছু শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ডলিউডের নতুন রাইডের ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত হতে পারেননি এবং তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত লাস ভেগাস কনসার্ট সিরিজ বাতিল করতে হয়েছিল। তবে অসুস্থতার মধ্যেও ২০২৬ সালের জুনে টেনেসির কর্নারসভিলে একটি পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্সে অংশ নিয়ে ভক্তদের চমকে দিয়েছিলেন তিনি।
ডলি পার্টনের ঝুলিতে রয়েছে ২০২১ সালের এমি পুরস্কার (ডলি পার্টন্স ক্রিসমাস অন দ্য স্কয়ার চলচ্চিত্রের জন্য), দুটি অস্কার মনোনয়ন, একটি টনি মনোনয়ন, ১৩টি একাডেমি অব কান্ট্রি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড এবং ১০টি কান্ট্রি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া তিনি ২০০৬ সালে কেনেডি সেন্টার সম্মাননা এবং ২০০৫ সালে ন্যাশনাল মেডেল অব আর্টস লাভ করেন। হলিউড ওয়াক অব ফেমে তাঁর দুটি তারকা রয়েছে, যার একটি ১৯৮৪ সালের একক কাজের জন্য এবং অন্যটি ২০১৯ সালে লিন্ডা রনস্ট্যাড ও এমিলু হ্যারিসের সাথে যৌথ অ্যালবামের জন্য দেওয়া হয়েছিল।





























