বাংলাদেশে গত ছয় মাসে অন্তত ১৮টি ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত এসব লোমহর্ষক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৭ জন মানুষ। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একের পর এক ঘটে যাওয়া এসব পারিবারিক হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলো ভিন্ন মনে হলেও গভীর বিশ্লেষণে এগুলোর মধ্যে সামাজিক ও কাঠামোগত সংকটের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত ১৮টি ঘটনার মধ্যে ১২টিতে একই পরিবারের দুজন করে নিহত হয়েছেন। এছাড়া দুটি ঘটনায় তিনজন করে, তিনটি ঘটনায় চারজন করে এবং একটি ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। মে মাস এবং আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেই ঘটেছে ১০টি ঘটনা, যাতে প্রাণ গেছে ২৭ জনের। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টিই ঘটেছে ভুক্তভোগীদের নিজেদের ঘরের ভেতরে বা আবাসস্থলে, যা ঘরের ভেতরের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
সম্প্রতি রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে (১২) শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের দাবি, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যদিও এ নিয়ে স্থানীয়দের মনে সন্দেহ রয়েছে। এর আগে গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা, ইকরা ও সিপাকে কুপিয়ে হত্যা করে অন্তর মজুমদার নামের এক যুবক, যিনি পরে গণপিটুনিতে মারা যান। স্থানীয়দের মতে, অন্তর মাদকাসক্ত ছিলেন এবং মাদকের টাকার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন।
মাদকাসক্তি ও বেকারত্বের কারণে গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের হাতে খুন হন স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত (৫৫)। আবার ১২ আগস্ট সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকায় ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনাকে (২০) হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার রংমিস্ত্রি বাবুল মিয়ার সঙ্গে গৃহপরিচারিকার সম্পর্কের টানাপোড়েনকে পুলিশ কারণ হিসেবে দেখালেও নিহত দম্পতির স্বজনরা এটিকে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন। প্রাথমিকভাবে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে ১৫-২০ দিনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বাবুল মিয়ার। যদিও পুলিশ বলছে, ২০ আগস্ট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবুল মিয়া। গত ছয় মাসে আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা-সৎভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার পাশাপাশি অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়া এই সহিংসতার অন্যতম বড় কারণ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে মানুষ পরিবার ও সমাজে নিরাপদ বোধ করবে। অন্যদিকে, পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, নিরাপত্তা কেবল রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির বিষয় নয়, এটি পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। ঘরের ভেতরের অপরাধগুলো অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমানতার বাইরে ঘটে, তবে পুলিশ অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে কাজ করছে।
দেশে সামগ্রিকভাবেও খুনের ঘটনা বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের (১ হাজার ৯৪৭টি) চেয়ে ১২৯টি বেশি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে অনেক সময় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। ‘হত্যা মামলার সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বছর মে মাসে জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন। এই সাজার কম হার এবং বিচারহীনতার পরিবেশ অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।




























