ইসলামি ক্যালেন্ডারের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় একটি দিন। ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত বর্ণনা অনুযায়ী, এই তারিখটি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম এবং ওফাত—উভয় ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই দিনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গুরুত্ব এবং একজন মুমিনের করণীয় গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের সূরা আল-আম্বিয়ার ৭১ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, তিনি প্রিয় নবীকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। মক্কা নগরীতে তাঁর এই আবির্ভাব কেবল একটি শিশুর জন্ম ছিল না, বরং এটি ছিল মানব ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা। তাঁর আগমনে অজ্ঞতা, অন্যায়, কুসংস্কার ও শোষণের অন্ধকার দূর হয়ে হেদায়াতের নূর ছড়িয়ে পড়েছিল।
হাদিস বিশারদ ও সাহাবিদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে রবিউল আউয়ালের ঠিক কোন তারিখে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ও আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। যদিও অনেক সূত্রে ১২ রবিউল আউয়ালকে তাঁর জন্মতারিখ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তবুও এ বিষয়ে সর্বসম্মত অকাট্য প্রমাণ নেই। একইভাবে, হিজরি ১১ সনের রবিউল আউয়াল মাসে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাতের সঠিক তারিখ নিয়েও মতভেদ থাকলেও ১২ রবিউল আউয়াল একটি বহুল প্রচলিত মত। হজরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, শেষ অসুস্থতায় তিনি আয়েশা (রা.)-এর ঘরেই ইন্তেকাল করেন।
জন্ম ও ওফাতের স্মৃতি একই তারিখের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় দিনটি আনন্দ ও বেদনার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ বহন করে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িনের যুগে এই দিনটিকে পৃথক কোনো উৎসব হিসেবে পালনের প্রচলন ছিল না। পরবর্তীকালে ফাতেমীয় শাসনামলে মিসরে এবং পরবর্তীতে সিরিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে মাওলিদ বা মিলাদুন্নবী পালনের প্রথা বিস্তৃত হয়। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে জন্মদিন উৎসব হিসেবে পালনের সরাসরি নির্দেশনা নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) সোমবার রোজা রাখতেন এবং এর কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ‘এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’
রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর অনুসরণ ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সূরা আল-আহযাবের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ—তার জন্য, যে আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সকল মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ এই ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, দরুদ পাঠ এবং আদর্শকে জীবনে ধারণের মাধ্যমে।
এই দিনে রাসূল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো তাঁর ওপর অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠ করা। সূরা আল-আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করো।’ হাদিস অনুযায়ী, একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ দশবার রহমত নাজিল করেন।
সীরাত অধ্যয়ন ও তাঁর জীবনাদর্শ নিয়ে চিন্তা করা এই দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল। দারিদ্র্যে ধৈর্য, শত্রুর প্রতি ক্ষমা, ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও বিনয় এবং ন্যায়বিচার ও সততার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা প্রতিটি মুমিনের জন্য শিক্ষণীয়। এই দিনে নিজের আমলের হিসাব নেওয়া, কুরআন তিলাওয়াত, নামাজে মনোযোগ বৃদ্ধি এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো নেক কাজে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁর ওফাতের স্মরণ আমাদের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়, যা আখিরাতের প্রস্তুতির জন্য প্রেরণা জোগায়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হয়। বাংলাদেশে এটি সরকারি ছুটির দিন। বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভা, সীরাত মাহফিল, কিরাত ও নাত প্রতিযোগিতা, ইসলামি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনেক স্থানে জশনে জুলুস বা শোভাযাত্রাও বের করা হয়। মিসর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মরক্কোর মতো মুসলিম দেশগুলোতেও স্থানীয় সংস্কৃতির আলোকে ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়। তবে আয়োজনের ধরন যা-ই হোক, মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত রাসূল (সা.)-এর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়ন করা। আজকের সংকটময় পৃথিবীতে তাঁর শিক্ষা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহিষ্ণুতার আদর্শই শান্তি ও কল্যাণের পথ দেখাতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ সাহাবিদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রিয় নবীর ওফাতের সংবাদ মদিনার আকাশে-বাতাসে শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাহাবায়ে কেরামের অশ্রু ও বেদনা আজও আমাদের হৃদয়ে অনুভূত হয়, যখন আমরা তার সুন্নাহ ও জীবনাদর্শ স্মরণ করি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ দ্বৈত অনুভূতি মুমিনের হৃদয়ে আত্মসমালোচনা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই তাঁর জন্মের স্মরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর আদর্শকে নতুন করে অনুধাবন করা এবং সুন্নাহকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা প্রতিদিনই তার স্মৃতি ও সুন্নাহকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতেন।
সূত্র: ডেইলি বাংলাদেশ






























