হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড ও প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের কর্মীদের একটি অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানি ও অর্থ লোপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (03 September 2026) ১২:০০ এএম-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র, ভিসা ও টিকিট থাকার পরও বোর্ডিং পাশের জন্য যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি আত্মসাৎ এবং ইকোনমি ক্লাসের টিকিট অবৈধভাবে বিজনেস ক্লাসে রূপান্তরের মাধ্যমে বিমানের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করা হচ্ছে। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে এই চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম এই অনিয়মকে অত্যন্ত গুরুতর আখ্যা দিয়ে বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনোভাবেই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। জড়িত কর্মীদের সিসিটিভি ফুটেজ, সিস্টেম লগ, ব্যাগেজ ট্যাগ ও পেমেন্ট রেকর্ড পরীক্ষা করে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। বিমানের গ্রাহকসেবা বিভাগের পরিচালক বদরুল হাসান লিটন জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, যাত্রী হয়রানি রোধে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট 'জিরো টলারেন্স' নির্দেশনা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানবন্দরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস বিভাগের একজন কাউন্টার সুপারভাইজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারের নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। চক্রের অন্য অভিযুক্ত সদস্যরা হলেন গ্রাউন্ড সার্ভিস সুপারভাইজার (জিএসএস) মো. জসিম উদ্দিন (জি-৫২১৯৫), গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট (জিএসএ) মোহাম্মাদ বুরহান উদ্দিন (জি-৫৩০৪৭) এবং জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজ (জি-৫৩০৩০)। তারা চেকইন ব্যাগেজের ওজনে কারচুপি, হজ এজেন্সির কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ এবং সাধারণ যাত্রীদের আটকে রেখে অর্থ আদায়ের মতো কাজ করে আসছিলেন।
গত ১৮ আগস্ট বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের যাত্রী মাহমুদ সারওয়ারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই অনিয়মের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। মাহমুদ সারওয়ার চারটি লাগেজ নিয়ে জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজের কাউন্টারে যান। সেখানে কর্মরত হেলপার ইব্রাহিম ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগ চেকইনের চুক্তি করেন। ইব্রাহিম জিএসএ বুরহানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বুরহান ওই যাত্রীকে ফিরোজের লাইনে পাঠান। রাত ১২টা ৫১ মিনিটে ফিরোজ ২৩ ও ২২ কেজি ওজনের দুটি ব্যাগ চেকইন করেন। তবে অতিরিক্ত ব্যাগ দুটি মাহমুদের নামে ট্যাগ না করে অন্য একটি গ্রুপের চারজন যাত্রীর নামে ইস্যু করা হয়। ওই চার যাত্রীর টিকিট নম্বর ছিল যথাক্রমে ৯৯৭২১০২২১৫৮৬১, ৯৯৭২১০২২১৫৮৬২, ৯৯৭২১০২২১৫৮৬৩ ও ৯৯৭২১০২২১৫৮৬৪ এবং তাদের সিকোয়েন্স নম্বর ছিল ১৩৬ থেকে ১৩৯। রাত ১১টা ১৮ মিনিটে বুরহান তাদের চেকইন করেছিলেন। ওই চার যাত্রীর আটটি ব্যাগের সুবিধা থাকলেও তারা পাঁচটি ব্যাগ জমা দিয়েছিলেন। বুরহানের পরামর্শে ফিরোজ ওই গ্রুপের সিকোয়েন্স ১৩৭-এর যাত্রী রুমেনা/হুসনা জান্নাতের নামে অতিরিক্ত দুটি ব্যাগের ট্যাগ ইস্যু করেন।
নিজের ক্লেইম ট্যাগে অন্য যাত্রীর নাম দেখে মাহমুদ সারওয়ার প্রতিবাদ শুরু করলে বিমানের নিরাপত্তা সুপারভাইজার মো. নিয়াজ মোরশেদ ভূঁইয়া ঘটনাস্থলে আসেন। যাত্রী জানান, ৫২ হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাকে কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হেলপার ইব্রাহিম পকেট থেকে টাকা বের করে টালবাহানা শুরু করেন এবং নিরাপত্তা সুপারভাইজার তার পাস জব্দ করেন। পরবর্তীতে যাত্রীর প্রোফাইলে নতুন ট্যাগ যুক্ত করে ব্যাগগুলো বেল্টে পাঠানো হয় এবং লোডিং সুপারভাইজার বে-১-এ আগের ট্যাগ খুলে নতুন ট্যাগ লাগান। রাত ১টা ৫৮ মিনিটে ফিরোজ আগের ট্যাগগুলো সিস্টেম থেকে ডিলিট করেন। এরপর ইব্রাহিমের কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা এবং যাত্রীর কাছ থেকে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসল পেমেন্ট স্লিপ দেওয়া হয়। তবে অভিযুক্তরা ক্ষমা চাওয়ায় কাউন্টার সুপারভাইজারের হস্তক্ষেপে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
চক্রটির বিরুদ্ধে আরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। গত ২১ জুলাই আবুধাবি হয়ে পর্তুগালগামী বিজি-৩২৭ ফ্লাইটের ৯ জন যাত্রীর কাগজপত্র পিসিইউ (পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট) অনুমোদন দিলেও কাউন্টার সুপারভাইজার বোর্ডিং পাশ আটকে জনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট এজেন্সি টাকা পরিশোধ করলে তাদের বোর্ডিং পাশ দেওয়া হয়। এছাড়া, সিঙ্গাপুরগামী এক যাত্রীর অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি বাবদ ৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন জিএসএ বুরহান। পরে যাত্রী বোর্ডিং গেটে অভিযোগ করলে কাউন্টার সুপারভাইজার সিস্টেম এডিট করে টাকা জমা দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেন। টরন্টোগামী ফ্লাইটে অর্থের বিনিময়ে ইকোনমি ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসে আসন আপগ্রেড করার ব্যবসাও করে এই চক্র। এমনকি হজ ক্যাম্পে নিয়মিত দায়িত্ব নিয়ে হজ এজেন্সিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে অর্থের বিনিময়ে বিজনেস ক্লাসের আসন বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।






























